নিরাপত্তা মানে শুধু বড় অপরাধের পরিসংখ্যান নয়। নিরাপত্তা মানে একজন নারী রাত দশটায় বাসে চড়ে বাড়ি ফিরতে পারছেন কি না, একজন দোকানদার চাঁদা না দিয়ে দোকান খুলতে পারছেন কি না, একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন কি না। ভিড়ের হাতে বিচার আমাদের ভয় দেখায়। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আদালতে হোক, রাস্তায় নয়। আর পুলিশের ওপর আস্থা ফিরবে তখনই, যখন তারা ক্ষমতাবানের নয়, আইনের পক্ষে দাঁড়াবে। আমরা চাই থানায় অভিযোগ নেওয়া সহজ হোক, মামলার অগ্রগতি অনলাইনে দেখা যাক, আর যে বাহিনী আমাদের রক্ষা করে, তাদের জবাবদিহিও যেন আমাদের কাছেই থাকে।
জমির খারিজ, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিদ্যুতের সংযোগ—সাধারণ নাগরিকের যে কোনো কাজে গেলে প্রথম প্রশ্ন আসে, কত লাগবে? যেখানে সেবা পাওয়া অধিকার, সেখানে সেটা কিনতে হয়। দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি টাকায় নয়। এটা মানুষকে শেখায় যে নিয়ম মানা বোকামি। যে তরুণ সৎভাবে চাকরির পরীক্ষা দেয় আর দেখে অন্য কেউ টাকা দিয়ে ঢুকে গেল, সে দেশের ওপর বিশ্বাস হারায়। আমাদের প্রস্তাব: যে সেবাগুলো অনলাইনে সম্ভব, সেগুলো পুরোপুরি অনলাইনে হোক যাতে মানুষের মুখোমুখি হতে না হয়; প্রতিটি অফিসে সেবার সময়সীমা ও ফি স্পষ্ট লেখা থাকুক; আর যারা ধরা পড়বে, তাদের শাস্তি প্রকাশ্যে হোক।
সরকারি হাসপাতালে সিট নেই, ওষুধ নেই, পরীক্ষা করাতে হয় বাইরে থেকে। বেসরকারি হাসপাতালে ঢুকলেই বিল এমন যে একটা বড় অসুখ মানে একটা পরিবারের সঞ্চয় শেষ। এই কারণেই অনেকে চিকিৎসা নেন না, বা দেরি করেন। ওষুধের দাম বছরে কয়েকবার বাড়ে, অথচ কোনো ব্যাখ্যা নেই। উপজেলা হাসপাতালে পদ থাকলেও ডাক্তার থাকেন না। যাদের সামর্থ্য আছে তারা বিদেশে যান; যাদের নেই তারা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেন। আমরা চাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সরকার ঠিক করে দিক এবং তা মানা হোক, উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তার থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক, আর প্রতিটি হাসপাতালের পরীক্ষার ফি বোর্ডে টাঙানো থাকুক।
গত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীরা একবার নয়, বারবার শুনেছে: পরীক্ষা পেছাল, সিলেবাস বদলাল, রুটিন আবার হবে। একটা কিশোর যদি জানে না তার পরীক্ষা কবে, সে প্রস্তুতি নেবে কীভাবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট ফিরে এসেছে। চার বছরের ডিগ্রি ছয় বছরে শেষ হলে সেই পরিবারের দুই বছর নষ্ট হয়, যারা হয়তো জমি বেচে ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছেন। আর প্রাথমিকে শিক্ষকের বেতন এত কম যে ভালো মানুষ এই পেশায় আসতে চান না। আমাদের চাওয়া: একাডেমিক ক্যালেন্ডার ঘোষণা হোক এবং তা মানা হোক, রাজনীতি ক্লাসরুমের বাইরে থাকুক, আর শিক্ষকের সম্মান ও বেতন এমন হোক যাতে মেধাবীরা শিক্ষক হতে চান।
সকালে যে দামে পেঁয়াজ কিনেছি, বিকেলে সেটাই বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, সবজি—কোনোটাই গত বছরের দামে নেই। মধ্যবিত্ত হিসাব করে চলে, কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ এখন হিসাব করার সুযোগও পাচ্ছে না; তারা খাবারের পরিমাণ কমাচ্ছে। সমস্যাটা শুধু বিশ্ববাজার নয়। পাইকারি থেকে খুচরা পর্যন্ত কয়েক হাত ঘুরে দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, আর তদারকি হয় কেবল ঘোষণায়। আমরা চাই বাজার মনিটরিং নিয়মিত হোক, কারা মজুত করছে তার তালিকা প্রকাশ হোক, আর টিসিবির ট্রাক শুধু শহরে নয়, উপজেলায়ও যাক। বেতন যদি না বাড়ে, অন্তত দামের লাগাম টানুন। একটা পরিবার শুধু বেঁচে থাকার জন্য যদি সারা মাস কাজ করে, তাহলে বাকি সব উন্নয়নের গল্প তার কাছে পৌঁছায় না।
একজন ভোটারের কাছে নির্বাচন মানে একটাই জিনিস: আমি আমার পছন্দের মানুষকে ভোট দিতে পারব তো, আর সেই ভোট গোনা হবে তো? এই দুই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর না পেলে বাকি সব আয়োজন অর্থহীন। আমরা চাই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথ নিরাপদ হোক, বুথে কেউ যেন কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে, ফলাফল কেন্দ্রভিত্তিক প্রকাশ হোক যাতে যে কেউ মিলিয়ে দেখতে পারে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষ থাকলে বাকি কাজটা জনগণ নিজেই করবে। তরুণ ভোটারদের অনেকেই জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে যাবেন। তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা যেন গণতন্ত্রের ওপর আস্থার শুরু হয়, হতাশার নয়।
গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি, রাজনীতির আলোচনা মানে হয়ে দাঁড়িয়েছে কে কাকে হারাবে, কে কার পেছনে লাগবে। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে বসে মানুষ যা নিয়ে কথা বলে, তা হলো চালের দাম, ছেলেমেয়ের চাকরি, হাসপাতালের ওষুধ। অস্থিরতার সবচেয়ে বড় দাম দেয় সাধারণ মানুষ। হরতাল হলে দিনমজুরের রোজগার বন্ধ, রাস্তায় সংঘর্ষ হলে স্কুল বন্ধ, অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগ থেমে যায়। আমরা কোনো দলের হয়ে বলছি না; আমরা চাই যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, সে যেন মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার হিসাব দিতে বাধ্য থাকে। আমাদের প্রস্তাব সহজ: সংলাপ হোক, সহিংসতা নয়। প্রতিটি দল তাদের কর্মসূচি স্পষ্ট করে বলুক, আর আমরা নাগরিকেরা কথা দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে বিচার করি।
২টির মধ্যে ২ নম্বর পাতা