তলাবিহীন ঝুড়ির গল্প, পর্ব ২: একাত্তর, মেধা হত্যা আর বিজয়ের পরের রাজনীতি
পর্যালোচনা করেছেনJonogoner Kotha· সম্পাদকীয় দল·
এটি তিন পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্বে দেখেছি দেশভাগ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ২৪ বছরের বৈষম্য। এবার সেই রাত, যখন আলোচনা থেমে গেল আর শুরু হলো গণহত্যা। প্রতিটি সংখ্যার সূত্র লেখার শেষে, বন্ধনীর নম্বর ধরে।
প্রথম পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-১-এক-দেশ
১৯৭১: নয় মাস
- ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টা: শুরু হয় "অপারেশন সার্চলাইট"। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আর পুরান ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ; বাংলাপিডিয়ার সংকলিত হিসাবে শুধু সেই রাতেই ঢাকায় নিহত হন প্রায় ৭ হাজার মানুষ। মধ্যরাতের পর গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান।
- ২৬–২৭ মার্চ: স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
- ১৭ এপ্রিল: মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (মুজিবনগর) অস্থায়ী সরকারের শপথ; রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান (তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম), প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।
- এপ্রিল–নভেম্বর: ১১টি সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ; গ্রাম থেকে গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ।
- ৩ ডিসেম্বর: ভারত-পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু; গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী। ৬ ডিসেম্বর ভুটান ও ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
- ১০–১৪ ডিসেম্বর: শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, লেখকদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা।
- ১৬ ডিসেম্বর: ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ; প্রায় ৯৩ হাজার সেনা ও বেসামরিক সহযোগী যুদ্ধবন্দী। জন্ম নেয় বাংলাদেশ।
সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে এভাবে, আর যুদ্ধের পর তাঁরা ফিরেছেন এত দ্রুত [১]:
- এপ্রিল ১৯৭১ শেষে: প্রায় ১০ লাখ
- মে ১৯৭১ শেষে: প্রায় ৪০ লাখ (দিনে লাখের বেশি মানুষ আসছিলেন)
- ১ ডিসেম্বর ১৯৭১: ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার; এর মধ্যে ৬৮ লাখ শিবিরে, ৩১ লাখ আত্মীয়-পরিচিতজনের বাড়িতে
- জানুয়ারি ১৯৭২ শেষে: প্রায় ৬০ লাখ ফিরে এসেছেন
- ২৫ মার্চ ১৯৭২: ভারতে বাকি মাত্র ৬০ হাজার
নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রাক্কলন ভিন্ন ভিন্ন। বাংলাদেশের সরকারি হিসাব ৩০ লাখ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর. জে. রামেলের হিসাবে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত ৩ লাখ থেকে ৩০ লাখ, তাঁর মধ্যম প্রাক্কলন ১৫ লাখ [২]। ২০০৮ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত জরিপভিত্তিক এক গবেষণায় শুধু সহিংসতায় মৃত্যু প্রায় ২ লাখ ৬৯ হাজার [৩]। এর বাইরে ভারতের শরণার্থী শিবিরে কলেরা, অপুষ্টি আর রোগে মারা যান আরও অনেকে; ২০২৫ সালের এক গবেষণা শুধু শরণার্থীদের মধ্যেই প্রায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে [৩]। সরকারি হিসাবে ২ লাখ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন; অন্য হিসাবে সংখ্যাটি ৪ লাখ পর্যন্ত। যুদ্ধের সময় ও পরে অবাঙালি (বিহারি) বেসামরিক মানুষও প্রতিশোধমূলক হত্যার শিকার হন [২]।
কোন প্রাক্কলন ধরা হবে, সে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে দ্বিমত নেই: ১৯৭১ বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি। এই ক্ষত জনমিতির সংখ্যাতেও ধরা পড়ে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলনে এই ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১৯৭০ সালে ছিল ৪২.৭ বছর; ১৯৭১ সালে তা নেমে আসে ২৬.৫ বছরে [৪]।
১৪ ডিসেম্বর: মেধার ওপর আঘাত
বুদ্ধিজীবী হত্যার শুরু আসলে ২৫ মার্চ রাতেই। প্রথম রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, পরিসংখ্যানের এ এন এম মুনিরুজ্জামানসহ কয়েকজন শিক্ষক নিহত হন; গুলিবিদ্ধ ইংরেজির শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা মারা যান ৩০ মার্চ। চার দিন পর কুমিল্লায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে, যিনি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিলেন; ময়নামতি সেনানিবাসে নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয় [৫]।
কিন্তু পরিকল্পিত হত্যার সবচেয়ে ভয়াবহ পর্ব আসে বিজয়ের ঠিক আগে। ১০ ডিসেম্বর থেকে কারফিউর মধ্যে চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয় শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক আর লেখকদের। শুধু ১৪ ডিসেম্বর রাতেই ঢাকা থেকে তুলে নেওয়া হয় দেড় শ থেকে দুই শতাধিক মানুষকে [৫][৬]। মিরপুর, মোহাম্মদপুরের শারীরিক শিক্ষা কলেজ, নাখালপাড়া আর রাজারবাগে ছিল নির্যাতনকেন্দ্র। বিজয়ের পর রায়েরবাজারের ইটখোলা আর মিরপুরের জলাভূমিতে পাওয়া যায় তাঁদের লাশ, চোখ বাঁধা, হাত পেছনে বাঁধা। কারও লাশ পাওয়া যায় তিন সপ্তাহ পরে; কয়েকজনের লাশ আর কখনো পাওয়া যায়নি।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে। গভর্নর হাউসে ফেলে যাওয়া তাঁর ডায়েরির একটি পাতায় পাওয়া যায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকা, যাঁদের বেশির ভাগ ১৪ ডিসেম্বর নিহত হন; ফরমান আলী পরে তালিকার অস্তিত্ব স্বীকার করলেও গণহত্যার উদ্দেশ্য অস্বীকার করেন [৫]। হত্যা বাস্তবায়ন করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী আধাসামরিক বাহিনী আলবদর ও আলশামস। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের নথি অনুযায়ী আলবদর গঠিত হয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে; অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন [৭]।
শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত হিসাব নেই। বাংলাপিডিয়ার প্রাক্কলন ১,১১১ জন [৫]; ১৯৭২ সালের সংকলন ও পত্রপত্রিকার ভিত্তিতে প্রথম আলোর হিসাবে প্রায় ১,০৭০ [৬]। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চার ধাপে ৫৬০ জনের নাম যাচাই করে প্রকাশ করেছে (১৯১, ১৪৩, ১০৮ ও ১১৮ জন); তালিকার কাজ এখনো শেষ হয়নি [৮]। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পেশা অনুযায়ী [৫]:
- শিক্ষাবিদ: ৯৯১ জন (৮৯ শতাংশ)
- চিকিৎসক: ৪৯ জন
- আইনজীবী: ৪২ জন
- সাংবাদিক: ১৩ জন
- সাহিত্যিক ও শিল্পী: ৯ জন
- প্রকৌশলী: ৫ জন
- অন্যান্য: ২ জন
বুদ্ধিজীবী হত্যা শুধু ঢাকার ঘটনা নয়। একই সারণিতে ঢাকা জেলায় ১৪৯ জন, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ শহীদ ছিলেন ঢাকার বাইরের: যশোরে ৯৭, কুমিল্লায় ৮৬, ময়মনসিংহে ৭৭, রংপুরে ৭৬, বরিশালে ৭৫, খুলনায় ৬৮, চট্টগ্রামে ৬৪ জন [৫]।
নিচে কয়েকটি নাম। প্রতিটি নামের পেছনে আছে আরও অনেক নাম।
- গোবিন্দ চন্দ্র দেব, দর্শন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২৬ মার্চ)
- জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ইংরেজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (গুলিবিদ্ধ ২৫ মার্চ)
- ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, আইনজীবী ও রাজনীতিক (মার্চ, কুমিল্লা)
- আলতাফ মাহমুদ, সুরকার ও শিল্পী (আটক ৩০ আগস্ট)
- সিরাজুদ্দীন হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক, ইত্তেফাক (১০ ডিসেম্বর)
- সেলিনা পারভীন, সম্পাদক, শিলালিপি (১৩ ডিসেম্বর)
- মুনীর চৌধুরী, নাট্যকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৪ ডিসেম্বর)
- মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, রাশীদুল হাসান, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, আবুল খায়ের, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৪ ডিসেম্বর)
- শহীদুল্লা কায়সার, যুগ্ম সম্পাদক, সংবাদ (১৪ ডিসেম্বর)
- চিকিৎসক মোহাম্মদ মর্তুজা, আবদুল আলীম চৌধুরী ও ফজলে রাব্বী (ডিসেম্বর)
- জহির রায়হান, চলচ্চিত্রকার; ভাইকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ (৩০ জানুয়ারি ১৯৭২)
বিচার এসেছে চার দশক পর। ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৮ জন বুদ্ধিজীবী (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন শিক্ষক, ৬ জন সাংবাদিক ও ৩ জন চিকিৎসক) হত্যার দায়ে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে তাঁদের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয় [৭]। তাঁরা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকায় রায় কার্যকর হয়নি। মুঈনুদ্দীন অভিযোগ অস্বীকার করেন; ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা চালানোর অনুমতি দেয়, আর তাঁর আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্র দপ্তর অভিযোগ প্রত্যাহার করে ক্ষমা চায় ও ক্ষতিপূরণ দেয় [৯]। বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ২০১৫ সালে এবং মতিউর রহমান নিজামীর ২০১৬ সালে ফাঁসি কার্যকর হয়।
১৯৭২ সাল থেকে ১৪ ডিসেম্বর পালিত হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। রায়েরবাজারের সেই ইটখোলায় ১৯৯৯ সালে উদ্বোধন হয় বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: ১১৫ মিটার লম্বা একটি বাঁকা ইটের দেয়াল [১০]। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল নতুন দেশকে মেধাশূন্য ও নেতৃত্বহীন করে দেওয়া।
১৯৭২: বিজয়ের পর, মিত্র আর সম্পদের প্রশ্ন
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরেন শেখ মুজিবুর রহমান। দেশ স্বাধীন, কিন্তু দেশের মাটিতে তখনো ভারতীয় সেনাবাহিনী। একাত্তরে ভারত প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, আর ডিসেম্বরের যুদ্ধে পূর্ব রণাঙ্গনে প্রাণ দিয়েছিলেন দেড় হাজারের মতো ভারতীয় সেনা; আশুগঞ্জের স্মৃতিস্তম্ভে নাম আছে ১,৬০০-র বেশি [১১]। ফেব্রুয়ারিতে শেখ মুজিবের কলকাতা সফরের পর ঘোষণা আসে, ভারতীয় সেনা ২৫ মার্চের মধ্যে ফিরে যাবে। ১২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে বিদায়ী কুচকাওয়াজ হয়, আর শেষ দলটি ফিরে যায় ১৫ মার্চ, নির্ধারিত সময়ের ১০ দিন আগে [১১]।
এই তিন মাস নিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক: ভারতীয় সেনারা কি বাংলাদেশ থেকে সম্পদ সরিয়ে নিয়েছিল? অভিযোগের সবচেয়ে পরিচিত কণ্ঠ ৯ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। তাঁর দাবি, খুলনা-যশোর অঞ্চলে ভারতীয় সেনাদের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদ করায় তাঁকে আটক করা হয়েছিল; ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বই "অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা" এই অভিযোগের সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত সূত্র [১২]। তবে তাঁর আটকের বিবরণ নিয়েই ভিন্নমত আছে: কোনো সূত্র বলছে, ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁকে "অসদাচরণের" অভিযোগে আটক করেন ৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা, আর তখনকার খুলনার জেলা প্রশাসক কামাল সিদ্দিকী ২০২৪ সালের স্মৃতিকথায় উল্টো জলিলের বিরুদ্ধেই সম্পত্তি দখলের অভিযোগ এনেছেন [১২]।
নথিতে যা আছে
- ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যানবাহন ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যায়; কিছু পাকিস্তানি ট্যাংক আজও ভারতের রেজিমেন্টাল জাদুঘরে যুদ্ধজয়ের স্মারক।
- মেজর জলিল প্রকাশ্যে এই অভিযোগ তুলেছিলেন এবং ১৯৭১-৭২ সালে আটক ছিলেন।
- ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার শেষ হয় ১৫ মার্চ ১৯৭২।
যে অভিযোগ আছে
- কারখানা ও পাটকলের যন্ত্রপাতি, যানবাহন, খাদ্যশস্য আর ঘরোয়া জিনিসপত্র ভারতে নিয়ে যাওয়া; সূত্র কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও লেখকের স্মৃতিকথা এবং সত্তরের দশকের বিরোধী পত্রপত্রিকা।
- প্রচলিত অঙ্কগুলো, যেমন "২০০ ওয়াগন অস্ত্র, ২,৭০০ কোটি টাকা" বা "৯০ হাজার কোটি টাকা", পরে লেখা দলীয় প্রকাশনায় পুরোনো পত্রিকার উদ্ধৃতি। আমরা কোনোটির স্বাধীন সমর্থন পাইনি।
আইন ও অপর পক্ষ
- আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে শত্রুপক্ষের সামরিক সরঞ্জাম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে জব্দ করা বৈধ, কিন্তু বেসামরিক বা ব্যক্তিগত সম্পদ লুট নিষিদ্ধ [১৩]। তাই পাকিস্তানি অস্ত্র নেওয়া আর বাংলাদেশের কারখানার যন্ত্র নেওয়া দুটি আলাদা প্রশ্ন।
- বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো দাবি বা তালিকা দিয়েছে, কিংবা ভারত সরকার আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে, এমন কোনো নথি আমরা পাইনি।
অর্থাৎ এই বিতর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রমাণের অভাব। ৫৪ বছরে কোনো সরকারি তদন্ত বা ক্ষতির তালিকা আমরা খুঁজে পাইনি। ফলে অভিযোগ টিকে আছে রাজনৈতিক বক্তব্যে, আর অস্বীকার টিকে আছে নীরবতায়। দুই দেশের আর্কাইভ খুলে দেওয়া একটি স্বাধীন ঐতিহাসিক অনুসন্ধানই এর মীমাংসা করতে পারে।
মৈত্রী চুক্তি আর ফারাক্কা
ভারতীয় সেনা ফেরার চার দিন পর, ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ, ঢাকায় সই হয় ২৫ বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তি। এর ৮ থেকে ১০ অনুচ্ছেদে দুই দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক জোটে না যাওয়ার এবং বিরোধে তৃতীয় পক্ষকে সাহায্য না করার অঙ্গীকার করে [১৪]। দেশের ভেতরে সমালোচকেরা চুক্তিটিকে সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর বলতেন; ১৯৯৭ সালে মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন হয়নি। পানির বিরোধও শুরু হয় তখনই: সীমান্তের ১৮ কিলোমিটার উজানে ফারাক্কা বাঁধ পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে [১৪]। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছর, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে।
১৯৫ জন: যে বিচার হয়নি
যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের জন্য বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন ভারতের হাতে বন্দী প্রায় ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর মধ্যে, আর পাকিস্তানে আটকা পড়েছিলেন লাখো বাঙালি সেনা, কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবার। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে সিমলা চুক্তি আর ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট দিল্লি চুক্তির পর শুরু হয় মানুষের বিনিময়: পাকিস্তান থেকে ফেরেন ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৫ জন বাঙালি, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে যান ১ লাখ ৮ হাজার ৭৪৪ জন অবাঙালি [১৫]।
১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের সময় পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। দেড় মাস পর, ৯ এপ্রিল দিল্লিতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে ওই ১৯৫ জনকেও বাকি বন্দীদের সঙ্গে ফিরিয়ে দেওয়া হয় [১৫]। চুক্তির ভাষায় অপরাধগুলো "হয়ে থাকতে পারে" বলে উল্লেখ ছিল; পাকিস্তানে তাঁদের কারও বিচার হয়নি। এর আগে ১৯৭২ সালের আগস্টে চীন নিরাপত্তা পরিষদে তার প্রথম ভেটো দিয়ে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আটকে দিয়েছিল; বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয় ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে।
পাকিস্তানের সঙ্গে হিসাব এখনো মেটেনি। অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ভাগ হিসেবে বাংলাদেশের দাবি ৪৩২ কোটি ডলার, সঙ্গে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য আসা বিদেশি সাহায্যের ২০ কোটি ডলার: মোট ৪৫২ কোটি ডলার [১৬]। ২০২৫ সালে ১৫ বছর পর দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে প্রশ্নটি আবার ওঠে; পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বিষয়গুলো "মীমাংসিত" দাবি করলে বাংলাদেশ তা নাকচ করে [১৬]। আটকে পড়া পাকিস্তানি বা "বিহারি" জনগোষ্ঠীর প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনো শতাধিক ক্যাম্পে থাকেন; ২০০৮ সালে হাইকোর্ট তাঁদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারের পক্ষে রায় দেয়।
১৯৭৪: ধ্বংসস্তূপ আর দুর্ভিক্ষ
স্বাধীন দেশের অর্থনীতি শুরু করেছিল প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ১৯৭২ সালে অর্থনীতি সংকুচিত হয় প্রায় ১৪ শতাংশ [৪]। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে যুদ্ধের পর ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় মাথাপিছু প্রকৃত আয় নেমে আসে ৮৭ শতাংশে, কৃষি উৎপাদন ৮৪ শতাংশে, শিল্প উৎপাদন মাত্র ৬৬ শতাংশে [১৭]। পাটকল, ব্যাংক, বিমা আর বড় কারখানার মালিকদের বেশির ভাগ ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি; নতুন সরকার এগুলো জাতীয়করণ করে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদ সংবিধান গ্রহণ করে। সত্তরের দশকের শেষে বৈদেশিক সাহায্য ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৮ শতাংশ; আজ তা ১ শতাংশের সামান্য বেশি [৪]।
১৯৭৪ সালে বন্যার পর চালের দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়, শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। সরকারি হিসাবে মারা যান ২৬ থেকে ২৭ হাজার মানুষ; স্বাধীন গবেষকদের প্রাক্কলন ১০ লাখের ওপরে, অর্থনীতিবিদ মহিউদ্দিন আলমগীরের হিসাবে অতিরিক্ত মৃত্যু প্রায় ১৫ লাখ [১৭]। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর Poverty and Famines (১৯৮১) বইয়ে দেখান, ১৯৭৪ সালে দেশে মাথাপিছু খাদ্যের জোগান আগের বছরগুলোর চেয়ে কম ছিল না, বরং কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। মানুষ মরেছে খাবারের অভাবে নয়, খাবার কেনার সামর্থ্য হারিয়ে।
এরপর রাজনীতিতে অস্থিরতার দীর্ঘ পর্ব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিবুর রহমান; ৩ নভেম্বর কারাগারে হত্যা করা হয় চার জাতীয় নেতাকে। অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান, যিনি ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত দেশ চালান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ; ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তাঁর পতনের পর ১৯৯১ সালে দেশ ফেরে সংসদীয় গণতন্ত্রে।
এই অস্থির দুই দশকে বাইরের দুনিয়া বাংলাদেশকে দেখত দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ আর সাহায্যের দেশ হিসেবে। কিন্তু এই সময়েই গ্রামে, ঘরে আর কারখানায় নীরবে শুরু হয়েছিল এমন কিছু পরিবর্তন, যা পরের চার দশকের গল্প লিখে দেবে। সেই গল্প তৃতীয় পর্বে।
তৃতীয় পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-৩-চার-নীরব
তথ্যসূত্র
- [১] ইউএনএইচসিআর, The State of the World's Refugees 2000, অধ্যায় ৩; ১ ডিসেম্বরের সংখ্যা জাতিসংঘ নথি A/8662/Add.3 (১৯৭২): https://web.archive.org/web/2016id_/http://www.unhcr.org/3ebf9bab0.pdf
- [২] আর. জে. রামেল, Statistics of Democide (১৯৯৭), অধ্যায় ৮: http://www.hawaii.edu/powerkills/SOD.CHAP8.HTM
- [৩] ওবারমেয়ার, মারে ও গাকিদু, BMJ ৩৩৬:১৪৮২ (২০০৮); অধিকারী, ইসলাম ও জালাল, PLOS ONE (২০২৫): https://journals.plos.org/plosone/article?id=10.1371/journal.pone.0320760
- [৪] বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস (গড় আয়ু, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক সাহায্য): https://data.worldbank.org/country/bangladesh
- [৫] বাংলাপিডিয়া, বুদ্ধিজীবী হত্যা (পেশা ও জেলাভিত্তিক সারণি) ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের জীবনী: https://en.banglapedia.org/index.php/Killing_of_Intellectuals
- [৬] প্রথম আলো, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪: https://en.prothomalo.com/bangladesh/kmknpq6avl
- [৭] আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান মামলার রায় (৩ নভেম্বর ২০১৩): https://bangladeshtrialobserver.org/2013/11/04/3-november-2013-ict-2-daily-summary-chowdhury-mueen-uddin-and-ashrafuzzaman-khan-found-guilty-on-11-charges-sentenced-to-death/ ; আলবদর গঠন নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যুক্তিতর্ক, ঢাকা ট্রিবিউন: https://www.dhakatribune.com/bangladesh/laws-rights/27629/al-badr-was-formed-by-chhatra-sangha-members-%E2%80%93
- [৮] মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী তালিকা, চতুর্থ ধাপ (২৪ মার্চ ২০২৪), দেশ রূপান্তর: https://www.deshrupantor.com/498529
- [৯] যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট, Mueen-Uddin v SSHD [2024] UKSC 21: https://caselaw.nationalarchives.gov.uk/uksc/2024/21/press-summary/1 ; তাঁর আইনজীবী প্রতিষ্ঠান কার্টার-রাকের বিবৃতি: https://www.carter-ruck.com/news/home-secretary-and-home-office-apologise-and-pay-225000-in-libel-damages-to-prominent-muslim-community-leader/
- [১০] বাংলাপিডিয়া, বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: https://en.banglapedia.org/index.php/Badhya_Bhumi_Smriti_Soudha
- [১১] প্রথম আলো, আশুগঞ্জের স্মৃতিস্তম্ভ (২৫ মার্চ ২০২৬): https://en.prothomalo.com/amp/story/bangladesh/mpipkijtl6 ; ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার, ডেইলি স্টার: https://www.thedailystar.net/backpage/news/indian-army-withdraws-bangladesh-1880827
- [১২] বাংলাপিডিয়া, মেজর এম এ জলিল: https://en.banglapedia.org/index.php/Jalil,_Major_Mohammad_Abdul ; এম এ জলিল, অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (১৯৮৯); কামাল সিদ্দিকী, In One Life, খণ্ড ২ (২০২৪); আটকের ভিন্ন বিবরণ: https://en.wikipedia.org/wiki/Mohammad_Abdul_Jalil
- [১৩] রেড ক্রস আন্তর্জাতিক কমিটি, প্রথাগত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, নিয়ম ৪৯ ও ৫২: https://ihl-databases.icrc.org/en/customary-ihl/v1/rule49
- [১৪] বাংলাপিডিয়া, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি: https://en.banglapedia.org/index.php/India-Bangladesh_Friendship_Treaty ; ফারাক্কা বাঁধ: https://en.banglapedia.org/index.php/Farakka_Barrage
- [১৫] বাংলাপিডিয়া, যুদ্ধবন্দীদের বিচার: https://en.banglapedia.org/index.php/Prisoners_of_War,_Trial_of ; দিল্লি চুক্তি ১৯৭৩: https://en.wikipedia.org/wiki/Delhi_Agreement ; ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ১৯৭৪, ঢাকা ট্রিবিউন: https://www.dhakatribune.com/amp/opinion/longform/343385/revisiting-the-1974-tripartite-agreement
- [১৬] দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, পাকিস্তানের কাছে ৪৫২ কোটি ডলারের দাবি (১৬ এপ্রিল ২০২৫): https://www.tbsnews.net/foreign-policy/govt-prepares-reclaim-452b-pre-independence-assets-pakistan-1117011 ; ঢাকা ট্রিবিউন (আগস্ট ২০২৫): https://www.dhakatribune.com/bangladesh/foreign-affairs/389808/pakistan-fm-claims-1971-issues-resolved-twice
- [১৭] বাংলাপিডিয়া, দুর্ভিক্ষ: https://en.banglapedia.org/index.php/Famine ; অমর্ত্য সেন, Poverty and Famines (১৯৮১); মহিউদ্দিন আলমগীর, Famine in South Asia (১৯৮০)
মন্তব্য