তলাবিহীন ঝুড়ির গল্প, পর্ব ১: এক দেশ, দুই অর্থনীতি আর ২৪ বছরের বৈষম্য
পর্যালোচনা করেছেনJonogoner Kotha· সম্পাদকীয় দল·
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর, ওয়াশিংটন। হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রশাসনের সংকট-বৈঠক চলছে। পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে, নতুন একটি দেশের জন্ম প্রায় নিশ্চিত। আলোচনার এক পর্যায়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি ইউ. অ্যালেক্সিস জনসন বললেন, দেশটি হবে একটি "আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস"। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার যোগ করলেন, তবে সেটা "আমাদের বাস্কেট কেস" হবে, এমন নয় [১]।
কথাটা প্রায়ই কিসিঞ্জারের নামে চলে, কিন্তু মার্কিন সরকারের প্রকাশিত বৈঠকের নথি বলছে, প্রথম বলেছিলেন জনসন। বাংলায় তা পরিচিত হলো "তলাবিহীন ঝুড়ি" নামে, আর পরের কয়েক দশক বাংলাদেশের গায়ে লেপটে থাকল।
সংখ্যাগুলোও তখন তাই বলছিল। ১৯৭২ সালে একজন বাংলাদেশির গড় বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ৮৮ ডলার; পাকিস্তানে তখন ১৪৮, ভারতে ১২৫ [২]। প্রতি হাজার শিশুর ২২৯ জন পাঁচ বছর বয়সের আগেই মারা যেত। একজন নারী গড়ে প্রায় সাতটি সন্তানের জন্ম দিতেন। দেশজুড়ে ভাঙা সেতু, বন্দরে ডোবানো জাহাজ আর মাইন, কোষাগার শূন্য।
এই লেখা তিন পর্বের একটি ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব। এখানে দেশভাগ থেকে ১৯৭০ সালের নির্বাচন; দ্বিতীয় পর্বে একাত্তরের যুদ্ধ, বুদ্ধিজীবী হত্যা আর বিজয়ের পরের রাজনীতি; তৃতীয় পর্বে স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের পথচলা আর আজকের বাংলাদেশ। প্রতিটি সংখ্যার সূত্র লেখার শেষে, বন্ধনীর নম্বর ধরে।
পাঁচ দশকে কী বদলেছে
- মাথাপিছু আয়: ১৯৭২ সালে ৮৮ ডলার, ২০২৫ সালে ২,৫৯৭ ডলার [২]
- পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু: প্রতি হাজারে ২২৯ (১৯৭২) থেকে ৩০ (২০২৪) [২]
- গড় আয়ু: ৪৯.৬ বছর (১৯৭২) থেকে ৭৪.৯ বছর (২০২৪) [২]
- একজন নারীর গড় সন্তান: ৬.৮ (১৯৭২) থেকে ২.১ (২০২৪) [২]
যে রাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশের জন্ম, সেই পাকিস্তানের চেয়ে মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ এখন প্রায় ৬৩ শতাংশ এগিয়ে; গড় আয়ু, শিশুমৃত্যু, নারীর কর্মসংস্থান আর মেয়েদের পড়াশোনাতেও এগিয়ে [২]। কীভাবে, তা তৃতীয় পর্বে। তবে গল্পটা ১৯৭১-এ শুরু হয়নি। শুরু তার ২৪ বছর আগে, মানচিত্রে আঁকা সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত একটি দেশে।
১৯৪৭: এক দেশ, মাঝখানে ১,৬০০ কিলোমিটার
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশ ভারত ভেঙে জন্ম নিল পাকিস্তান। রাষ্ট্রটির দুটি অংশ: পশ্চিমে আজকের পাকিস্তান, পূর্বে আজকের বাংলাদেশ। মাঝখানে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড। এক অংশ থেকে আরেক অংশে যেতে হলে হয় উড়োজাহাজে ভারতের আকাশ পেরোতে হতো, নয়তো জাহাজে শ্রীলঙ্কা ঘুরে কয়েক হাজার কিলোমিটারের সমুদ্রপথ।
ধর্ম ছাড়া দুই অংশের মিল ছিল সামান্য। ভাষা আলাদা, খাবার আলাদা, পোশাক, সাহিত্য, জলবায়ু আর অর্থনীতিও আলাদা। আর সবচেয়ে বড় অমিলটা ছিল সংখ্যায়।
- আয়তন: পূর্ব বাংলা ৫৪,৮৮৫ বর্গমাইল, দেশের মাত্র ১৫ শতাংশ; পশ্চিম ৩,১১,০২২ বর্গমাইল, ৮৫ শতাংশ [৩]
- জনসংখ্যা, ১৯৫১: পাকিস্তানের ৭ কোটি ৫৭ লাখ মানুষের প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ পূর্বে, অর্থাৎ ৫৫.৫ শতাংশ [৩]
- জনসংখ্যা, ১৯৬১: পূর্বে ৫ কোটি ৮ লাখ, পশ্চিমে ৪ কোটি ৩০ লাখ; পূর্বের ভাগ ৫৪.২ শতাংশ [৩]
- ঘনত্ব, ১৯৬১: পূর্বে প্রতি বর্গমাইলে ৯২৫ জন, পশ্চিমে ১৩৬ জন [৩]
দেশের বেশির ভাগ মানুষ বাঙালি, কিন্তু রাজধানী করাচি, সেনা সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডি, কেন্দ্রীয় সরকার, বড় ব্যবসা আর ব্যাংকের মালিকানা প্রায় সবই পশ্চিমে। এই অসমতাই পরের ২৪ বছরের রাজনীতির মূল সূত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোটে ক্ষমতা পেলে ক্ষমতা যাবে পূর্বে। সেটা ঠেকানোর চেষ্টা আর তার বিরুদ্ধে লড়াই, এই টানাপোড়েনেই কেটেছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১।
১৯৫২: মায়ের ভাষার দাম
নতুন রাষ্ট্রের প্রথম বড় বিরোধ বাঁধল ভাষা নিয়ে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পাকিস্তানের ৫৬.৪ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা [৪]। আর উর্দু? পশ্চিম পাকিস্তানেই উর্দু ছিল মাত্র ৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা; পুরো দেশের হিসাবে ৩ শতাংশের কাছাকাছি। পশ্চিম পাকিস্তানে মাতৃভাষার ভাগ ছিল এ রকম [৪]:
- পাঞ্জাবি ৬৭.১ শতাংশ
- সিন্ধি ১২.৯ শতাংশ
- পশতু ৮.২ শতাংশ
- উর্দু ৭.১ শতাংশ
- বেলুচি ৩.০ শতাংশ
তবু ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। তিন দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তনে একই কথা বলতেই ছাত্রদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ ওঠে [৫]।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এসে আবারও উর্দুর পক্ষে কথা বলেন। প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ডাকা হয়, আর সরকার জারি করে ১৪৪ ধারা। ছাত্ররা তা ভেঙে মিছিলে নামলে পুলিশ গুলি চালায়। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ হন রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালাম, শফিউর রহমান, নয় বছরের শিশু অহিউল্লাহসহ আরও অনেকে [৫]।
রক্তের দামে আসে স্বীকৃতি। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হয়। অনেক পরে, ১৯৯৯ সালে, ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। পৃথিবীজুড়ে আজ যে দিনটি পালিত হয়, তার শুরু ঢাকার রাস্তায়।
ভাষা আন্দোলন একটা প্রশ্ন স্পষ্ট করে দিয়েছিল: সংখ্যায় বেশি হয়েও বাঙালিরা নিজেদের রাষ্ট্রে সমান অধিকার পাবে কি না। উত্তরটা এল দুই বছর পর। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ৩০৯ আসনের ২২৩টি জিতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে প্রায় মুছে দেয়; মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন [৬]। দুই মাসের মাথায় কেন্দ্রীয় সরকার সেই প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেয়।
এরপর ১৯৫৬ সালের সংবিধানে চালু হয় "সংখ্যাসাম্য" নীতি: জাতীয় পরিষদে দুই অংশের আসন সমান সমান, যদিও পূর্বের মানুষ বেশি। ভোটের হিসাবে একজন বাঙালির ভোট হয়ে গেল একজন পশ্চিম পাকিস্তানির ভোটের চেয়ে কম ওজনের।
১৯৬৬: দুই অর্থনীতি, ছয় দফা
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। পরের দশকে পাকিস্তানের অর্থনীতি দ্রুত বেড়েছে, আন্তর্জাতিক মহলে আইয়ুবের "উন্নয়নের দশক" প্রশংসাও পেয়েছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের ভাগ কোথায় যাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদেরা তা হিসাব কষে দেখাতে শুরু করলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, পাকিস্তানে আসলে দুটি আলাদা অর্থনীতি চলছে, আর একটির সম্পদ নিয়মিত চলে যাচ্ছে আরেকটিতে। এটিই পরিচিতি পায় "দুই অর্থনীতি তত্ত্ব" নামে।
পাকিস্তান সরকারের নিজের পরিকল্পনা দলিলই সেই দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৯-৬০ সালের স্থির মূল্যে মাথাপিছু আয় ছিল এ রকম [৭]:
- ১৯৪৯-৫০: পশ্চিম ৩৩৮ রুপি, পূর্ব ২৮৭ রুপি; পশ্চিম এগিয়ে ১৮ শতাংশ
- ১৯৫৯-৬০: পশ্চিম ৩৬৬ রুপি, পূর্ব ২৭৮ রুপি; ব্যবধান ৩২ শতাংশ
- ১৯৬৯-৭০: পশ্চিম ৫৩৭ রুপি, পূর্ব ৩৩১ রুপি; ব্যবধান ৬২ শতাংশ
লক্ষ করুন, প্রথম দশকে পূর্বের মানুষের আয় বাড়েনি, উল্টো কমেছে। একই সময়ের বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে ১৯৪৯-৫০ সালের ব্যবধান প্রায় ২৫ শতাংশ আর ১৯৭০ সালের দিকে সরকারি হিসাবে ৩৮ শতাংশ বলা হয়েছে; বেসরকারি হিসাবে তা ১০০ শতাংশেরও বেশি [৮]। মাপ যা-ই হোক, দিক একটাই: ব্যবধান বেড়েছে।
টাকা কোথায় খরচ হলো
পূর্বে দেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ থাকলেও উন্নয়ন ব্যয়ে তার ভাগ ছিল এর অনেক নিচে [৯][৭]:
- ১৯৫০-৫৫ (পরিকল্পনার আগে): ২০ শতাংশ
- প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ১৯৫৫-৬০: ২৬ শতাংশ
- দ্বিতীয় পরিকল্পনা, ১৯৬০-৬৫: ৩২ শতাংশ
- তৃতীয় পরিকল্পনা, ১৯৬৫-৭০: ৩৬ শতাংশ
বিশ্বব্যাংকের ১৯৭০ সালের প্রতিবেদন অন্য মাপে, অর্থাৎ সরকারি পরিকল্পনা-বরাদ্দে, তৃতীয় পরিকল্পনায় পূর্বের ভাগ ৪৩ থেকে ৫০ শতাংশ দেখায়; তবে সেখানেই বলা হয়েছে, পূর্বে প্রকৃত খরচ হয়েছিল বরাদ্দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ [৮]। শিল্প-ঋণের হিসাব আরও একতরফা: পিআইডিসি, পিআইসিআইসি ও আইডিবিপির মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে আসা বিদেশি সম্পদের প্রায় ৭৭ শতাংশ গেছে পশ্চিমে [৯]।
পাটের ডলার, পশ্চিমের কারখানা
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ আসত পূর্ব থেকে, মূলত পাট বেচে; অথচ আমদানিতে পূর্বের ভাগ ছিল ৩০ শতাংশের মতো [৯]। ১৯৫০ সালের শেষে পাট একাই দেশের রপ্তানি আয়ের ৪৫ শতাংশ এনে দিত [৯][১০]। পূর্বের চাষির পাট বেচে আসা বৈদেশিক মুদ্রায় যন্ত্রপাতি আর কাঁচামাল আসত করাচি, লাহোর আর লায়লপুরের কারখানার জন্য। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাহবুবুল হকের ১৯৬৩ সালের হিসাবে প্রতিবছর পূর্বের আয়ের ৪ থেকে ৫ শতাংশ এভাবে পশ্চিমে চলে যেত [৯]।
চেয়ারগুলো কার
রাষ্ট্র চালানোর চেয়ারগুলোতেও একই ছবি। জনসংখ্যায় ৫৫ শতাংশ হয়েও ক্ষমতার পদে পূর্ব পাকিস্তানিদের ভাগ ছিল এ রকম [১১][১২]:
- সেনা কর্মকর্তা (মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল), ১৯৫৬: ৮৯৪ জনে ১৪ জন
- নৌবাহিনীর কর্মকর্তা, ১৯৫৬: ৫৯৩ জনে ৭ জন
- বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা, ১৯৫৬: ৬৪০ জনে ৪০ জন
- সেনা কর্মকর্তা, ১৯৬৫: ৫ শতাংশ
- কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব, ১৯৬২: ১৯ জনে ১ জন
- যুগ্মসচিব, ১৯৬২: ৪৬ জনে ৭ জন
- উপসচিব, ১৯৬২: ১২৬ জনে ২৪ জন
১৯৭১ সাল পর্যন্ত মেজর জেনারেল বা তার ওপরের পদে পৌঁছেছিলেন মাত্র তিনজন বাঙালি [১২]।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এই ক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৭ দিনের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল কার্যত অরক্ষিত; সামরিক নীতি ছিল, পূর্বের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে পশ্চিমের রণাঙ্গনে। বাঙালিরা বুঝলেন, যুদ্ধ লাগলে তাঁদের রক্ষা করার কেউ নেই।
এই পটভূমিতে ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে বিরোধী দলগুলোর সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পেশ করেন ছয় দফা দাবি। ছয়টির তিনটিই ছিল সরাসরি অর্থনীতি নিয়ে:
- সংসদীয় পদ্ধতির যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার, প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আইনসভা।
- কেন্দ্রের হাতে থাকবে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়।
- দুই অংশের জন্য আলাদা কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা, অথবা এক মুদ্রা হলে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পুঁজি পাচার ঠেকানোর সাংবিধানিক ব্যবস্থা।
- কর আরোপ ও আদায়ের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে।
- দুই অংশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আলাদা হিসাব।
- আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য প্রদেশের নিজস্ব আধাসামরিক বাহিনী।
সরকার জবাব দিল মামলা দিয়ে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আনা হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ফল হলো উল্টো। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আসাদ, মতিউর, ড. শামসুজ্জোহাসহ অনেকে নিহত হন; ফেব্রুয়ারিতে মামলা প্রত্যাহার করতে হয়, আর মার্চে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়েন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে। ইয়াহিয়া প্রতিশ্রুতি দিলেন নির্বাচনের: এক ব্যক্তি, এক ভোট।
১৯৭০: ঝড়, তারপর ভোট
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে ভোলাসহ উপকূলে আঘাত হানে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। প্রায় সাড়ে ১০ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসে মারা যান আনুমানিক ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় [১৩]। ত্রাণ পাঠাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ধীরগতি পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষোভকে আরও তীব্র করে।
সাড়ে তিন সপ্তাহ পর, ৭ ডিসেম্বর, পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন, প্রাপ্তবয়স্কদের সরাসরি ভোটে। ফল ছিল দ্ব্যর্থহীন। জাতীয় পরিষদের ৩০০ সাধারণ আসনে সরকার গঠনের জন্য দরকার ছিল ১৫১টি [১৪]:
- আওয়ামী লীগ: ১৬০টি আসন, সবই পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টির মধ্যে; পূর্বের ৭৫ শতাংশ ভোট
- পাকিস্তান পিপলস পার্টি (জুলফিকার আলী ভুট্টো): ৮১টি, সবই পশ্চিমে
- অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র: ৫৯টি
- সংরক্ষিত ১৩টি নারী আসনসহ মোট ৩১৩ আসনে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি; সারা দেশে তাদের ভোট ৩৯.২ শতাংশ
দশ দিন পর প্রাদেশিক পরিষদেও ৩০০ আসনের ২৮৮টি পায় আওয়ামী লীগ। গণতন্ত্রের নিয়মে আওয়ামী লীগেরই সরকার গঠনের কথা। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর হলো না। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের নির্ধারিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। পূর্ব পাকিস্তান অচল হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলনে।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" ইউনেস্কো ২০১৭ সালে ভাষণটিকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করে। আলোচনার আড়ালে তখন পশ্চিম থেকে আসছিল সৈন্য আর অস্ত্র।
পরের পর্বে
২৪ বছরের বৈষম্যের এই হিসাব শেষ হয় একটি রাতে: ২৫ মার্চ ১৯৭১। দ্বিতীয় পর্বে নয় মাসের যুদ্ধ, এক কোটি শরণার্থী, ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যা, আর বিজয়ের পর ভারতীয় সেনা, সম্পদ সরানোর অভিযোগ ও যুদ্ধাপরাধীদের ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি।
দ্বিতীয় পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-২-একাত্তর-মেধা তৃতীয় পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-৩-চার-নীরব
তথ্যসূত্র
- [১] Foreign Relations of the United States 1969–1976, খণ্ড ১১, নথি ২৩৫: ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপের বৈঠক, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: https://history.state.gov/historicaldocuments/frus1969-76v11/d235
- [২] বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস (মাথাপিছু জিডিপি, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যু, প্রজনন হার; ৭ অক্টোবর ২০২৬ নামানো): https://data.worldbank.org/country/bangladesh
- [৩] বিশ্বব্যাংক, Development Programing and Economic Conditions in Pakistan (১৯৬১), পাকিস্তানের আদমশুমারি ১৯৫১ ও ১৯৬১-এর তথ্য: http://documents1.worldbank.org/curated/en/455411468146961306/txt/multi0page.txt
- [৪] তারিক রহমান, Language Planning and Politics in Pakistan, এসডিপিআই (১৯৯৫), ১৯৫১ সালের আদমশুমারির মাতৃভাষার সারণি; পুরো দেশে উর্দুর প্রায় ৩ শতাংশ আমাদের হিসাব: https://web.archive.org/web/2015id_/http://www.sdpi.org/publications/files/R9-Language%20Planning%20and%20Politics%20in%20Pakistan.pdf
- [৫] বাংলাপিডিয়া, ভাষা আন্দোলন: https://en.banglapedia.org/index.php/Language_Movement
- [৬] বাংলাপিডিয়া, যুক্তফ্রন্ট: https://en.banglapedia.org/index.php/United_Front
- [৭] এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিসকাশন পেপার ৬৩ (২০০৬), সারণি ১; মূল সূত্র তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও চতুর্থ পরিকল্পনার অর্থনীতিবিদ প্যানেলের প্রতিবেদন (১৯৭০): https://www.nuff.ox.ac.uk/economics/history/paper63/63asadullah.pdf
- [৮] বিশ্বব্যাংক, Current Economic Position and Prospects of Pakistan, রিপোর্ট SA-15a (১৯৭০): https://documents1.worldbank.org/curated/en/476711468287133417/pdf/multi0page.pdf
- [৯] আইয়াজ গুল, জার্নাল অব দ্য পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, খণ্ড ২৮ (২০১৫): https://pu.edu.pk/images/journal/HistoryPStudies/PDF-FILES/Ayyaz%20Gul_v28No1jun2015.pdf
- [১০] কে. জেড. দুররানি, Pakistan Economic and Social Review (১৯৫৬): https://pu.edu.pk/images/journal/pesr/PDF-FILES/7%20DURRANI%20Foreign%20Trade%20of%20Pakistan-V_4_1956.pdf
- [১১] লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, Bangladesh: A Country Study (১৯৮৮): http://www.country-data.com/cgi-bin/query/r-1216.html
- [১২] ইলিয়াস চট্টা, Modern Asian Studies ৫৮ (২০২৪), পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের বিতর্ক (১৯৬২) উদ্ধৃত করে: https://www.cambridge.org/core/services/aop-cambridge-core/content/view/A1DD8500DB876D2C3BEC764676E0CF61/S0026749X23000525a.pdf
- [১৩] বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়: https://wmo.int/media/news/worlds-deadliest-tropical-cyclone-was-50-years-ago
- [১৪] পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের প্রতিবেদন (১৯৭৫) উদ্ধৃত করে Pakistan Vision, খণ্ড ২৫ (২০২৪): https://pu.edu.pk/images/journal/studies/PDF-FILES/5_v25_2_24.pdf
মন্তব্য