তলাবিহীন ঝুড়ির গল্প, পর্ব ৩: চার নীরব বিপ্লব থেকে আজকের বাংলাদেশ
পর্যালোচনা করেছেনJonogoner Kotha· সম্পাদকীয় দল·
এটি তিন পর্বের ধারাবাহিকের শেষ পর্ব। প্রথম পর্বে পাকিস্তান আমলের বৈষম্য, দ্বিতীয় পর্বে একাত্তর আর বিজয়ের পরের রাজনীতি। স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশক বাইরের দুনিয়া বাংলাদেশকে দেখত দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ আর সাহায্যের দেশ হিসেবে। এবার দেখা যাক, কীভাবে সেই ছবি বদলাল, আর আজ কোন প্রশ্ন সামনে। প্রতিটি সংখ্যার সূত্র লেখার শেষে।
প্রথম পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-১-এক-দেশ দ্বিতীয় পর্ব: https://jonogonerkotha.com/bn/posts/তলাবিহীন-ঝুড়ির-গল্প-পর্ব-২-একাত্তর-মেধা
১৯৭৮: চারটি নীরব বিপ্লব
বাংলাদেশের উত্থানের কোনো একক নায়ক নেই। সংখ্যা ঘাঁটলে দেখা যায় চারটি আলাদা ধারা, যেগুলো প্রায় একই সময়ে শুরু হয়ে একে অন্যকে শক্তি জুগিয়েছে: মাঠে কৃষক, ঘরে মা, কারখানায় নারী শ্রমিক, আর বিদেশে প্রবাসী।
১. মাঠে: চার গুণ ধান
১৯৭২ সালে দেশে দানাশস্য (মূলত ধান ও গম) উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ টন; ২০২৪ সালে ৬ কোটি ৬৩ লাখ টন, চার গুণের বেশি। একই সময়ে মানুষ বেড়েছে আড়াই গুণের মতো, ৭ কোটি ১৬ লাখ থেকে ১৭ কোটি ৩৬ লাখ, আর আবাদি জমি কমেছে [১]। অগভীর নলকূপের সেচ, উচ্চফলনশীল ধানের জাত, শুকনো মৌসুমের বোরো ধান আর সারের ব্যবহার এই বদলের মূল চালিকা। যে দেশের নাম একসময় দুর্ভিক্ষের সঙ্গে উচ্চারিত হতো, সেখানে ১৯৭৪-এর পর আর কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি।
২. ঘরে: মা আর শিশু
ডায়রিয়া ছিল শিশুমৃত্যুর বড় কারণ। এর সমাধানের বড় অংশ এসেছিল ঢাকা থেকেই: ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকার কলেরা গবেষণা কেন্দ্রের (আজকের আইসিডিডিআর,বি) গবেষকেরা খাবার স্যালাইনের কার্যকারিতা প্রমাণে বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ব্র্যাকের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মাকে শেখান কীভাবে লবণ আর গুড় দিয়ে ঘরেই স্যালাইন বানাতে হয় [২]। একই সময়ে শুরু হয় টিকাদান কর্মসূচি আর ঘরে ঘরে পরিবার পরিকল্পনার পরামর্শ। ফলাফল [১]:
- ১০০টি শিশুর মধ্যে পাঁচ বছর বয়সের আগে মারা যেত ১৯৭২ সালে ২৩ জন, ২০২৪ সালে ৩ জন
- একজন নারীর গড় সন্তান ৬.৮ (১৯৭২) থেকে ২.১ (২০২৪); পাকিস্তানে এখনো ৩.৫
- সাত বছরের বেশি বয়সী মানুষের সাক্ষরতা ২৬.৮ শতাংশ (১৯৭৪ সালের শুমারি) থেকে ৭৪.৮ শতাংশ (২০২২) [৩]
- মাধ্যমিক স্কুলে প্রতি ১০০ ছেলের বিপরীতে মেয়ে ৩৫ জন (১৯৭৩) থেকে ১২৪ জন (২০২১); মেয়েদের উপবৃত্তি চালু হয় ১৯৮২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে, ১৯৯৪ সালে সারা দেশে
৩. কারখানায়: একটি চুক্তি থেকে ৩৯ বিলিয়ন ডলার
১৯৭৮ সালের ৪ জুলাই সাবেক সরকারি কর্মকর্তা নুরুল কাদেরের প্রতিষ্ঠান দেশ গার্মেন্টস দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে; ১৩০ জন বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয় কোরিয়ার বুসানে। তাঁদের অনেকে পরে নিজেরাই কারখানা খোলেন। একই মাসে, ২৮ জুলাই, রিয়াজ গার্মেন্টস ফ্রান্সে পাঠায় ১০ হাজার শার্টের একটি চালান [৪]। পোশাক রপ্তানির ভাগ বেড়েছে এভাবে [৫]:
- ১৯৮৩-৮৪: মোট রপ্তানির ৩.৯ শতাংশ
- ১৯৯০-৯১: ৫০.৫ শতাংশ
- ২০১০-১১: ৭৮.২ শতাংশ
- ২০২৫-২৬: ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার, মোট রপ্তানির ৮০.৬ শতাংশ
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ছিল চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক; তবে ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ভাগ কমে ৬.৮ শতাংশে নেমেছে, এগিয়ে আসছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া [৬]। এই শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ, যাঁদের ৫৫ শতাংশের বেশি নারী; আশির দশকে এই হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ [৬]। এই সাফল্যের দাম দিতে হয়েছে চড়া: ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে নিহত হন অন্তত ১,১৩৪ জন শ্রমিক। এর পর কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সংস্কার আসে, কিন্তু ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন এখনো মীমাংসিত নয়।
৪. বিদেশে: প্রবাসীর পাঠানো টাকা
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক যাওয়া শুরু হয়। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছিল মাত্র ১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার; ২০০০-০১ সালে ১৮৮ কোটি, ২০১০-১১ সালে ১,১৬৫ কোটি, আর ২০২৫-২৬ সালে রেকর্ড ৩,৫৫৯ কোটি ডলার (৩৫.৬ বিলিয়ন) [৭]। ১৯৭৬ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিদেশে কাজের ছাড়পত্র নিয়েছেন ১ কোটি ৮৫ লাখের বেশি মানুষ [৭]। এই টাকা গ্রামের ঘর পাকা করেছে, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছে, আর দুর্দিনে দেশের রিজার্ভ টিকিয়ে রেখেছে।
ফল: দারিদ্র্য কমল, তারপর থমকে গেল
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষ (উচ্চ দারিদ্র্যরেখা) [৮]:
- ১৯৯১-৯২: ৫৬.৭ শতাংশ
- ২০০০: ৪৮.৯ শতাংশ
- ২০০৫: ৪০.০ শতাংশ
- ২০১০: ৩১.৫ শতাংশ
- ২০১৬: ২৪.৩ শতাংশ
- ২০২২: ১৮.৭ শতাংশ; চরম দারিদ্র্য ৪১ থেকে নেমে ৫.৬ শতাংশ
তবে অগ্রগতি থমকে গেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন বলছে, ২০২২ সালের পর উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দারিদ্র্য আবার বেড়েছে: ২০২৫ সালে ২১.২ শতাংশ, প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ [৯]। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির ২০২৫ সালের জরিপে হারটি ২৭.৯ শতাংশ, যদিও পদ্ধতি আলাদা। ২০২২ সালের পর বিবিএসের নতুন কোনো দারিদ্র্য জরিপ প্রকাশিত হয়নি।
২০১৬: যে দেশ থেকে আলাদা হয়েছিলাম
১৯৭২ সালে একজন পাকিস্তানির গড় আয় ছিল একজন বাংলাদেশির প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের ডলারভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যায়; ক্রয়ক্ষমতার (পিপিপি) হিসাবে আরও আগে, ২০১১ সালে [১]। ভারতের সঙ্গে তুলনা আরও কাছাকাছি: ২০১৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ডলারের হিসাবে বাংলাদেশ সামান্য এগিয়ে ছিল, টাকার দরপতনে ২০২৫ সালে ভারত আবার এগিয়ে গেছে [১]। তিন প্রতিবেশী, তখন আর এখন [১]:
- মাথাপিছু আয় (১৯৭২ থেকে ২০২৫, ডলার): বাংলাদেশ ৮৮ থেকে ২,৫৯৭; পাকিস্তান ১৪৮ থেকে ১,৫৯৬; ভারত ১২৫ থেকে ২,৭০২
- গড় আয়ু (১৯৭২ থেকে ২০২৪, বছর): বাংলাদেশ ৪৯.৬ থেকে ৭৪.৯; পাকিস্তান ৫৩.৮ থেকে ৬৭.৮; ভারত ৪৯.২ থেকে ৭২.২
- পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু (প্রতি হাজারে): বাংলাদেশ ২২৯ থেকে ৩০.৫; পাকিস্তান ১৮৪ থেকে ৫৬; ভারত ২০৮ থেকে ২৬.৬
- শ্রমবাজারে নারী (২০২৫): বাংলাদেশ ৩৮.৭ শতাংশ; পাকিস্তান ২৪.১; ভারত ৩২.৪
- জিডিপিতে শিল্প-উৎপাদনের ভাগ (২০২৫): বাংলাদেশ ২২.৪ শতাংশ; পাকিস্তান ১৩.০; ভারত ১৩.৫
গবেষকেরা একে বলেছেন "বাংলাদেশ প্যারাডক্স" বা বাংলাদেশের ধাঁধা [১০]: দুর্নীতির সূচকে নিচের দিকে, রাজনীতি সংঘাতময়, প্রতিষ্ঠান দুর্বল, তবু সামাজিক সূচকে এত দ্রুত অগ্রগতি। কয়েকটি উত্তর: এনজিও আর ক্ষুদ্রঋণের বিশাল নেটওয়ার্ক (১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক আর মুহাম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান; আজ ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা ৩ কোটির বেশি, বেশির ভাগ নারী), নারীদের ঘরের বাইরে আসা, খাবার স্যালাইন-টিকা-নলকূপের মতো কম খরচের প্রযুক্তি, আর সরকার বদলালেও কিছু সামাজিক কর্মসূচির ধারাবাহিকতা।
২০০০ সালে দেশের মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ ছিল, ২০২২ সালে ৯৯ শতাংশের বেশি [১]। ২০২২ সালের ২৫ জুন চালু হয় ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু; বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর সেতুটি তৈরি হয় দেশের নিজস্ব টাকায়, খরচ ৩০,১৯৩ কোটি টাকা [১১]। একই বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় চালু হয় মেট্রোরেল।
তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে প্রশ্নও জমেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় অংশ অলস বসিয়ে রেখেও চুক্তি অনুযায়ী "ক্যাপাসিটি চার্জ" দিতে হয়েছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী টানেলে ২০২৪ সালের অক্টোবরে দিনে গাড়ি চলেছে গড়ে ৩,৯১০টি, প্রাক্কলন ছিল ১৭ হাজারের বেশি [১১]। ২০২৪ সালে দেখা যায়, রপ্তানির সরকারি হিসাব নয় মাসে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল [১২]। বিশ্বব্যাংক ২০২৫ সালে লিখেছে, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব সতর্কতার সঙ্গে পড়া উচিত, কারণ তা বাড়িয়ে দেখানো হয়ে থাকতে পারে [৯]। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির প্রাক্কলন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালে দেশ থেকে বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে [১৩]।
২০২৪–২৬: আজকের বাংলাদেশ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিহত হন ১,৪০০ জন পর্যন্ত, যাঁদের ১২-১৩ শতাংশ পর্যন্ত শিশু [১৪]। ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান; ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। ২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয় এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে [১৫]; নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তিনি রায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের ফলে বিএনপি পায় ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি; ভোট পড়ে ৫৯.৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারেনি। গণভোটে "হ্যাঁ" জয়ী হয় ৬৮.৩ শতাংশ ভোটে [১৬]। ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
অর্থনীতি: স্বস্তি আর চাপ একসঙ্গে
- সরকারি হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় প্রথমবার ৩,০০০ ডলার ছাড়িয়েছে (৩,০২০ ডলার, সাময়িক) [১৭]
- মোট রিজার্ভ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের ২৪.৯ বিলিয়ন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৬.৪ বিলিয়ন ডলার; আইএমএফের পদ্ধতিতে ৩১.৫ বিলিয়ন [১৮]
- প্রবৃদ্ধি ২০২৪-২৫ সালে ৩.৫ শতাংশ, ২০২৫-২৬ সালে সাময়িক হিসাবে ৪.১; চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ৩.৪ শতাংশ [১৯]
- মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১১.৬৬ শতাংশ; ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ৮.৩৪ শতাংশ, যেখানে মজুরি বেড়েছে ৭.৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রকৃত মজুরি কমছে [২০]
- ব্যাংকের মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ, প্রায় ৬ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি; এর ৭২ শতাংশের বেশি মাত্র ১০টি ব্যাংকে [২১]
২০১৮ ও ২০২১ সালে দুবার তিনটি মানদণ্ডই পূরণের পর জাতিসংঘ ঠিক করেছিল, বাংলাদেশ ২৪ নভেম্বর ২০২৬ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে। নতুন সরকার প্রস্তুতির জন্য তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে; ৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি [২২]।
সামনের ছয় প্রশ্ন
- তরুণদের কাজ: শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ৮৫ লাখের বেশি তরুণ পড়াশোনা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নেই [২৩]।
- এক পণ্যের ঝুঁকি: রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি পোশাক, আর বিশ্ববাজারে সেই ভাগ কমছে; এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপের শুল্কমুক্ত সুবিধা ধাপে ধাপে কমবে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ১৯ শতাংশ শুল্ক।
- ব্যাংক খাত: খেলাপি ঋণের ভার কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত।
- রাজস্ব: কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশেরও কম, বিশ্বে সর্বনিম্নগুলোর একটি।
- জলবায়ু: বিশ্বব্যাংকের হিসাবে একটি বড় বন্যা জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে, আর ২০৫০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ জলবায়ুর কারণে দেশের ভেতরে ঘর ছাড়তে পারেন [২৪]।
- রোহিঙ্গা: কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ শরণার্থী; গত দেড় বছরে নতুন করে এসেছেন আরও প্রায় দেড় লাখ।
শেষ কথা
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনের বৈঠকে যাঁরা "বাস্কেট কেস"-এর কথা বলেছিলেন, সংখ্যার বিচারে তাঁরা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। যে শিশুর পাঁচ বছর বাঁচার সম্ভাবনা ছিল চারে তিন, আজ তার সম্ভাবনা একশোয় সাতানব্বই। যে দেশ নিজের মানুষকে খাওয়াতে পারত না, সে এখন চার গুণ ধান ফলায়। যে নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করতেন না, তাঁদের হাতে গড়া পোশাক আজ পৃথিবীর বড় বড় দোকানে।
কিন্তু সংখ্যাগুলো একটা সতর্কবার্তাও দেয়। দেশভাগের পর ২৪ বছর বাঙালিরা লড়েছিল দুটি দাবিতে: উন্নয়নের ভাগ যেন সবাই পায়, আর ক্ষমতা যেন মানুষের ভোটে ঠিক হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও এই দুই প্রশ্ন পুরোপুরি মীমাংসিত নয়। আয় বেড়েছে, কিন্তু বিবিএসের হিসাবে আয়বৈষম্যের গিনি সহগও বেড়েছে, ২০১০ সালের ০.৪৫৮ থেকে ২০২২ সালে ০.৪৯৯ [২৫]। ভোট হয়েছে, কিন্তু বারবার সেই ভোট নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। আর ২০২২ সালের পর দারিদ্র্য আবার বাড়ছে।
তলাবিহীন ঝুড়ির গল্পটা বদলে গেছে। পরের অধ্যায়টা কেমন হবে, তা লিখবেন এই দেশের মানুষ। আপনার চোখে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটি, আর সামনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ? জনগণের কথা-য় নিজের মত লিখুন, নাম দিয়ে বা নাম ছাড়াই।
তথ্যসূত্র
- [১] বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস (৭ অক্টোবর ২০২৬ নামানো): https://data.worldbank.org/country/bangladesh
- [২] ব্র্যাকের খাবার স্যালাইন কর্মসূচি, ব্রিজস্প্যান: https://www.bridgespan.org/oral-rehydration-bangladesh
- [৩] বাংলাপিডিয়া, সাক্ষরতা: https://en.banglapedia.org/index.php/Literacy
- [৪] প্রথম পোশাক রপ্তানি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/node/196057
- [৫] বিজিএমইএ, রপ্তানি ইপিবির তথ্যে: https://www.bgmea.com.bd/page/Export_Performance
- [৬] বিশ্ববাজারে পোশাকের ভাগ, ঢাকা ট্রিবিউন: https://www.dhakatribune.com/business/415031/vietnam-cambodia-snatch-bangladesh-rmg%E2%80%99s-market ; শ্রমিকসংখ্যা, ইউএনবি: https://unb.com.bd/category/bangladesh/state-minister-informs-parliament-of-number-of-workers-in-rmg-sector/137930
- [৭] বাংলাদেশ ব্যাংক, Monthly Report on Workers' Remittance Inflows (আগস্ট ২০২৬): https://www.bb.org.bd/pub/monthly/remittance/publication.pdf
- [৮] পরিকল্পনা কমিশন (জিইডি), Bangladesh Moving Ahead with SDGs (২০১৯) ও বিবিএস এইচআইইএস ২০২২: https://gedkp.gov.bd/wp-content/uploads/2021/02/Bangladesh-Moving-Ahead-with-SDGs-74th-UNGA-Session.pdf
- [৯] বিশ্বব্যাংক, Bangladesh Poverty and Equity Assessment (নভেম্বর ২০২৫): https://documents1.worldbank.org/curated/en/099112525183511448/pdf/P501761-dfa72c79-9394-4291-83e1-ea462da8221f.pdf
- [১০] আসাদুল্লাহ, সাভোইয়া ও মাহমুদ, World Development ৬২ (২০১৪): https://ideas.repec.org/a/eee/wdevel/v62y2014icp138-154.html
- [১১] পদ্মা সেতু: https://en.wikipedia.org/wiki/Padma_Bridge ; কর্ণফুলী টানেল: https://en.wikipedia.org/wiki/Karnaphuli_Tunnel
- [১২] রপ্তানির হিসাব সংশোধন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/node/893051
- [১৩] শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদন, প্রথম আলো: https://en.prothomalo.com/business/local/yur9qsg81m
- [১৪] জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়, তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন (ফেব্রুয়ারি ২০২৫): https://www.ohchr.org/en/stories/2025/02/un-human-rights-investigation-may-support-accountability-bangladeshi-student
- [১৫] আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/bangladesh/politics/awami-league-banned-1140321
- [১৬] নির্বাচন কমিশনের ফল, ইউএনবি: https://unb.com.bd/category/Election/bnp-sweeps-with-209-seats-jamaat-gets-68-ncp-6-ec/179518 ; গণভোট, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/bangladesh-election-2026/yes-wins-referendum-records-60-turnout-1360606
- [১৭] মাথাপিছু আয় ৩,০২০ ডলার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/economy/fy26-bangladeshs-capita-income-crosses-3000-first-time-1459091
- [১৮] রিজার্ভ, বাসস: https://www.bssnews.net/business/422424
- [১৯] বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট, বিডিনিউজ২৪: https://bdnews24.com/economy/kvj6d4hubo
- [২০] সেপ্টেম্বরের মূল্যস্ফীতি ও মজুরি, বিডিনিউজ২৪: https://bdnews24.com/economy/hotvno31ay
- [২১] খেলাপি ঋণ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/economy/banking/ten-banks-hold-over-72-tk6-lakh-cr-defaulted-loans-1539221
- [২২] এলডিসি উত্তরণ নিয়ে জাতিসংঘের প্রক্রিয়া, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/economy/bangladeshs-ldc-graduation-when-and-how-will-un-decide-1554346
- [২৩] শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস: https://thefinancialexpress.com.bd/home/bd-jobless-rate-hits-3-yr-high-at-366pc-in-2024
- [২৪] বিশ্বব্যাংক, Country Climate and Development Report (২০২২): https://www.worldbank.org/en/news/press-release/2022/10/31/urgent-climate-action-crucial-for-bangladesh-to-sustain-strong-growth
- [২৫] বিবিএস এইচআইইএস ২০২২-এর আয়বৈষম্য, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: https://www.tbsnews.net/node/665214
মন্তব্য