কারখানা বন্ধ, মজুরি বকেয়া: যাঁদের ঘামে রপ্তানি, তাঁদের পাশে কে?
পর্যালোচনা করেছেনJonogoner Kotha· সম্পাদকীয় দল·
সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের যেকোনো শ্রমিক-পাড়ায় এখন একটা প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়: "বেতন কবে দেবে?" কেউ দুই মাসের মজুরি পাননি, কারও ঈদের বোনাস আটকে আছে, কেউ এক সকালে গিয়ে দেখেছেন গেটে তালা আর একটা নোটিশ। যে খাত দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা, সেই খাতের শ্রমিকেরাই এখন সবচেয়ে অনিশ্চয়তায়। আমরা গত কয়েক মাসের প্রতিবেদন, শ্রমিক সংগঠনের দাবি আর সরকারি পদক্ষেপ মিলিয়ে দেখেছি। এই লেখা সেই হিসাব, আর শেষে আমাদের প্রস্তাব।
সংখ্যায় সংকট
জুলাইয়ে প্রকাশিত "থ্রেডস আন্ডার প্রেশার" নামের এক প্রতিবেদনে জাস্টিস মেকারস বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন—এই ছয় মাসেই ৮০টি কারখানার ২০,৭৮৩ জন শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন [১]। বড় ছবিটা আরও ভারী: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৫৭টি পোশাক ও বস্ত্র কারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকার হয়েছেন ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শ্রমিক [১]।
কেন বন্ধ হলো, তার ভাগও প্রতিবেদনে আছে: ২০৫টি কারখানা পর্যাপ্ত অর্ডার না পেয়ে, ১৯০টি দেউলিয়া হয়ে, ১১টি শ্রমিক অসন্তোষের কারণে, আর ৫১টি অন্যান্য কারণে [১]। অর্থাৎ "শ্রমিকেরা আন্দোলন করে কারখানা বন্ধ করাচ্ছে"—এই প্রচলিত কথাটা সংখ্যায় টেকে না; বন্ধের বড় কারণ অর্ডার আর টাকার সংকট।
বড় নাম, বড় ধাক্কা
কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পতন একাই হাজার হাজার পরিবারকে টলিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নাসা গ্রুপ তাদের ১৬টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে, কাজ হারান সাড়ে ১২ হাজারের বেশি শ্রমিক [২]। মালিকপক্ষ মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর মাসের পর মাস মজুরি বকেয়া থাকে; শেষে সরকার কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) একজন কর্মকর্তাকে প্রশাসক বসায় শ্রমিকের পাওনা মেটাতে [৩], আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে পাওনা শোধের সিদ্ধান্ত আসে [৪]। বেক্সিমকো গ্রুপে ২০২৪ সালের শেষে ১৫টি ইউনিটের প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হন [২]।
মালিক কারাগারে গেলে বা ব্যাংক ঋণ আটকে গেলে মামলা চলে বছরের পর বছর। কিন্তু শ্রমিকের ঘরভাড়া, মুদির দোকানের বাকি আর সন্তানের স্কুলের বেতন অপেক্ষা করে না।
বকেয়ার চেয়েও বেশি কিছু
জেএমবিএফের প্রতিবেদন শুধু বেতন আটকে থাকার কথা বলেনি। বকেয়া ওভারটাইম আর উৎসব ভাতা, কারণ ছাড়া ছাঁটাই, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বাতাস চলাচলের ঘাটতি, অসহনীয় গরম, গাদাগাদি করা ফ্লোর আর একসঙ্গে বহু শ্রমিকের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে [১]। ক্ষতির ভার বেশি পড়েছে নারী শ্রমিকদের ওপর, যাঁরা এই খাতের বড় অংশ [১]।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয়: প্রতিবেদন বলছে, বকেয়া মজুরির দাবিতে মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভেও লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড আর রাবার বুলেট ব্যবহার হয়েছে [১]। যে শ্রমিক নিজের কাজের টাকা চাইছেন, তাঁর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সমস্যার মতো আচরণ সংকটকে আরও গভীর করে।
তিন বছর আগের মজুরি, আজকের বাজার
পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা, নির্ধারিত হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে [৫]। সংশোধিত শ্রম আইনে এখন প্রতি তিন বছরে মজুরি পর্যালোচনার বিধান আছে; সেই হিসাবে নতুন মজুরি এ বছরই প্রাপ্য। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন আর ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণা করে ডিসেম্বর থেকে কার্যকরের দাবি জানিয়েছে, অক্টোবরজুড়ে কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে [৫]।
এর মধ্যে বাজার থেমে থাকেনি। আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ [৬], আর টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে [৭]। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হয়েছে [৮]; শ্রমিক সংগঠনগুলো সেটাকেই যুক্তি হিসেবে সামনে আনছে [৫]। প্রশ্নটা ন্যায্য: একই বাজারে একজনের আয় বাড়লে, পাশের জনের আয় তিন বছর আগের জায়গায় থাকলে সংসার চলবে কীভাবে?
চাকরি গেলে কোথায় যান তাঁরা
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকের সামনে নতুন কারখানার দরজা সব সময় খোলা থাকে না। অনেকে অনানুষ্ঠানিক কাজে চলে যাচ্ছেন—ব্যাটারি রিকশা চালানো, মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার, দিনমজুরি [২]। শ্রম অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, দেশ "কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি" থেকে এখন প্রবৃদ্ধিও কম, কর্মসংস্থানও কম—এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে [২]। বিশেষ করে নারী শ্রমিকেরা কাজ হারালে প্রায়ই আর শ্রমবাজারে ফেরেন না, ফলে পরিবারের আয়ের একটা স্থায়ী অংশ হারিয়ে যায়।
আমাদের প্রস্তাব
প্রথম, মজুরি নিশ্চয়তা তহবিল। রপ্তানি আয়ের একটা ছোট অংশ দিয়ে এমন একটি তহবিল হোক, যা কোনো কারখানা বন্ধ হলে বা মজুরি দুই মাসের বেশি বকেয়া থাকলে সরাসরি শ্রমিককে মজুরি, ছুটির পাওনা আর সার্ভিস বেনিফিট দেবে; পরে তহবিল সেই টাকা মালিকের সম্পদ থেকে আদায় করবে। শ্রমিক অপেক্ষা করবেন না, মামলা অপেক্ষা করবে।
দ্বিতীয়, প্রশাসক নিয়োগ নিয়মে আনা। নাসার মতো ঘটনায় সরকার প্রশাসক বসিয়েছে, কিন্তু অনেক মাস পরে। আইন করে বলা হোক: মজুরি দুই মাস বকেয়া হলেই প্রশাসক নিয়োগ আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওনা শোধের পরিকল্পনা প্রকাশ বাধ্যতামূলক।
তৃতীয়, মজুরি বোর্ড সময়মতো। তিন বছরের বিধান যেন কাগজে না থাকে। বোর্ড এখনই বসুক, আলোচনায় মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাব আর শ্রমিকের প্রকৃত খরচের জরিপ দুটোই থাকুক, আর ঘোষিত মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হোক।
চতুর্থ, মজুরির ডিজিটাল খাতা। প্রতিটি রপ্তানিমুখী কারখানার মজুরি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে যাক, আর কারখানাভিত্তিক বকেয়ার তথ্য ডাইফের ওয়েবসাইটে প্রতি মাসে প্রকাশ হোক। বকেয়া যখন সবাই দেখতে পাবে, তখন তা লুকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
পঞ্চম, কারখানার ভেতরের নিরাপত্তা। গরম, বাতাস চলাচল আর পানির ন্যূনতম মান নির্ধারণ করে নিয়মিত পরিদর্শন হোক; একসঙ্গে বহু শ্রমিক অসুস্থ হলে স্বাধীন তদন্ত বাধ্যতামূলক হোক।
ষষ্ঠ, ক্রেতাদেরও দায়। যে বিদেশি ব্র্যান্ড সস্তায় পোশাক কেনে, অর্ডার বাতিল বা দাম কমানোর চাপের দায় তাদেরও। সরকার ও মালিক সংগঠন একসঙ্গে ক্রেতাদের কাছে ন্যায্য দাম আর বকেয়া মজুরি তহবিলে অংশ নেওয়ার দাবি তুলুক।
সপ্তম, প্রতিবাদের অধিকার। পাওনার দাবিতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বলপ্রয়োগ বন্ধ হোক, আর যেসব ঘটনায় শক্তি প্রয়োগ হয়েছে, তার স্বাধীন তদন্ত হোক। ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার রক্ষা করাই অসন্তোষ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ।
শেষ কথা
পোশাক খাত আমাদের গর্ব, কিন্তু সেই গর্বের ভিত্তি একজন শ্রমিক, যিনি ভোরে কারখানায় ঢোকেন আর মাস শেষে বেতনের অপেক্ষা করেন। কারখানা বন্ধ হতে পারে, অর্ডার কমতে পারে; কিন্তু যে কাজ শ্রমিক করে ফেলেছেন, তার টাকা আটকে থাকা কোনো অর্থনৈতিক বাস্তবতা নয়, এটা অন্যায়। আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ পোশাক খাতে কাজ করলে জানান: আপনার কারখানায় মজুরি সময়মতো হচ্ছে কি না, ছাঁটাই হলে পাওনা পেয়েছেন কি না। আপনাদের অভিজ্ঞতা দিয়েই পরের অনুসন্ধান শুরু হবে।
তথ্যসূত্র
- [১] বকেয়া মজুরি, গণছাঁটাই ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ; জেএমবিএফের "থ্রেডস আন্ডার প্রেশার" প্রতিবেদন (১৫ জুলাই ২০২৬) — IANS: https://ianslive.in/concerns-raised-over-unpaid-wages-mass-layoffs-unsafe-working-conditions-in-bangladeshs-garment-sector--20260715113038
- [২] চাকরির নিরাপত্তাহীন বছর: নাসা ও বেক্সিমকোর ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ — Asia News Network: https://asianews.network/2026-is-year-without-job-security-in-bangladesh/
- [৩] নাসা গ্রুপে প্রশাসক নিয়োগ, শ্রমিকের পাওনা পরিশোধে — The Financial Express: https://thefinancialexpress.com.bd/trade/govt-appoints-administrator-at-nassa-group-to-clear-workers-dues
- [৪] শ্রমিকের পাওনা মেটাতে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি (জানুয়ারি ২০২৬) — Ecotextile News: https://www.ecotextile.com/2026012161387/news/social-compliance-and-csr/apparel-giants-assets-to-be-sold-off-to-pay-workers/
- [৫] মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন ও নতুন ন্যূনতম মজুরির দাবি (২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/economy/rmg/industriall-demands-wage-board-reconstitution-new-minimum-wage-garment-workers-1547676
- [৬] আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬% (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/bangladesh/inflation-eases-again-2nd-straight-month-1535836
- [৭] টানা ৫০ মাস মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি (১৩ এপ্রিল ২০২৬) — The Daily Star: https://www.thedailystar.net/business/news/inflation-outpaces-wages-50-months-4150166
- [৮] নতুন পে স্কেলের গেজেট, কার্যকর ১ জুলাই (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/bangladesh/gazette-issued-national-pay-scale-2026-1547116
মন্তব্য