ব্যাটারি রিকশা: যে গাড়ি ঢাকাকে সচল রাখে, সেটাই কেন শহরটাকে থামিয়ে দিচ্ছে
পর্যালোচনা করেছেনJonogoner Kotha· সম্পাদকীয় দল·
ঢাকার যেকোনো মোড়ে এক মিনিট দাঁড়ালে এখন একটা দৃশ্য অবধারিত: নীল-সবুজ ছাউনির ব্যাটারি রিকশা, সামনে-পেছনে দুই সারি যাত্রী, একটানা হর্ন, আর উল্টো পথে হঠাৎ ঘুরে যাওয়া। গাড়িটা সস্তা, দ্রুত আর সব গলিতে ঢোকে; তাই মানুষ এটাতেই ওঠে। আবার এই গাড়িটাই এখন শহরের গতি, বিদ্যুৎ আর রাস্তার নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বড় চাপ। আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারি বক্তব্য, আদালতের আদেশ, বুয়েটের গবেষণা আর মাঠের জরিপ মিলিয়ে দেখেছি। এই লেখাটা সেই অনুসন্ধানের সারসংক্ষেপ, আর শেষে আমাদের প্রস্তাব।
১. এক দশকে ২১ থেকে ৫ কিলোমিটার
ব্যাটারি রিকশা আসার আগেই ঢাকা থেমে যাচ্ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০০৭ সালে ঢাকার গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার; দশ বছরে তা নেমে আসে ৭ কিলোমিটারে, আর প্রতিদিন নষ্ট হতে থাকে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা [১]। বুয়েটের পরের হিসাব আরও খারাপ: ২০২০ সালে পিক আওয়ারে গড় গতি ৬.৫ কিলোমিটার, ২০২২ সালে ৪.৮ কিলোমিটার—মানে হেঁটে গেলেও প্রায় একই সময় লাগে [২]। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে যানজটে ঢাকার বছরে ক্ষতি ৩৭ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা [৩]। অর্থাৎ শহরটা আগে থেকেই ধীর ছিল; ব্যাটারি রিকশা সেই ধীর শহরে ঢুকেছে লাখে লাখে।
২. কত গাড়ি, কোথা থেকে এল
সংখ্যাটা নিয়ে কারও একমত নেই, আর সেটাই সমস্যার প্রথম প্রমাণ। বুয়েটের ২০২৫ সালের এক গবেষণা বলছে ঢাকায় প্রায় ৬ লাখ ব্যাটারি রিকশা চলে, যার মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ঢুকেছে ২০২৪ সালের আগস্টের পালাবদলের পরে, যখন রাস্তায় নজরদারি ঢিলে হয়ে যায় [৪]। সরকারের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির হিসাবে ঢাকায় ১২ লাখের বেশি (১০ লাখ রিকশা, ২ লাখ ইজিবাইক), আর সারা দেশে ৪০ লাখের মতো [৫]। ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দেশে ৫০ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারি অটোরিকশা চলছে [৬]। গুলশান-বনানী-বাড্ডা এলাকার চালক সমিতির হিসাবে ২০২৪ সালের আগস্টের আগে ওই এলাকায় ছিল প্রায় ৩ হাজার গাড়ি; ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৮ হাজার [৭]। যে দেশে কেউ জানে না রাস্তায় কত গাড়ি, সেখানে পরিকল্পনা করার আগে গোনা দরকার।
৩. যন্ত্রটাই কেন বিপজ্জনক
বেশির ভাগ ব্যাটারি রিকশা আসলে প্যাডেল রিকশার কাঠামোতে একটা মোটর আর চার-পাঁচটা লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি বসানো গাড়ি। প্যাডেল রিকশার ফ্রেম, চাকা আর ব্রেক ঘণ্টায় ৮-১০ কিলোমিটারের জন্য বানানো; মোটর লাগালে সেটা ৩০-৪০ কিলোমিটারে ছোটে, কিন্তু ব্রেক থাকে আগের ইউ-ব্রেকই, পেছনের চাকায় অনেক সময় ব্রেকই নেই [৪, ৮]। হাইকোর্ট ২০২১ সালেই এই কথা বলেছিল: পেছনের চাকায় ঠিকঠাক ব্রেক নেই, বিআরটিএর কোনো অনুমোদন নেই [৯]। তার ওপর ছয়জন যাত্রী তোলা হয়, যা গাড়িটার ভরকেন্দ্র ওপরে তুলে দেয়; মোড় ঘুরলেই উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি।
চালকের দিকটাও একই রকম। ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ২০২৬ সালের জানুয়ারির জরিপে দেখা গেছে, ব্যাটারি রিকশার প্রায় ৬০ শতাংশ চালকের অভিজ্ঞতা দুই বছরের কম, ৭৫ শতাংশ পরিবহনে একেবারে নতুন, আর প্যাডেল রিকশাচালকদের গড় অভিজ্ঞতা যেখানে ১৫ বছর [১০]। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, কোনো লাইসেন্স নেই; ৯৭ শতাংশের বেশি গাড়ি কোনো নিবন্ধনের বাইরে চলে [৮]।
৪. দূরত্ব, ভাড়া আর গ্যারেজের হিসাব: গাড়িটা কেন এভাবে চলে
রাস্তায় ব্যাটারি রিকশা যে ভাবে চলে—হঠাৎ থামা, উল্টো পথ, মূল সড়কে ঢুকে পড়া—তা চালকের বদমেজাজ নয়, একটা হিসাবের ফল। ভাড়া ঠিক হয় দূরত্ব নয়, দরাদরিতে; ট্রিপ সাধারণত ১০ থেকে ৫০ টাকার, ছোট ছোট দূরত্বে [১০]। জরিপ বলছে, প্রায় ৪০ শতাংশ চালক দিনে ৩১ থেকে ৫০টি ট্রিপ মারেন; প্যাডেল রিকশায় এই হার মাত্র ১২.৬ শতাংশ [১০]। বেশি ট্রিপ মানে বেশি আয়, আর বেশি ট্রিপ মানে যত দ্রুত সম্ভব যাত্রী নামিয়ে পরের যাত্রী তোলা—যেখানে দাঁড়ালে যাত্রী মেলে সেখানেই দাঁড়ানো, রাস্তার মাঝখানে হলেও।
এই তাড়ার পেছনে আছে গ্যারেজের হিসাব। মাত্র ২১ শতাংশ চালক নিজের গাড়ি চালান; ৭৯ শতাংশ ভাড়ায় [১০]। একজন চালকের দিনের গড় আয় ৮৩২ টাকা, তার মধ্যে ৪১৪ টাকা—প্রায় অর্ধেক—চলে যায় গ্যারেজ ভাড়ায়; বাকি ৪১৮ টাকা থেকে চার্জ, খাওয়া, বাসা ভাড়া, মেরামত আর "অনানুষ্ঠানিক" খরচ [১০]। যাঁরা নিজের গাড়ি কিনেছেন, তাঁদের ৬০ শতাংশ এনজিও বা ক্ষুদ্রঋণে কিনেছেন, গড়ে ৮০ হাজার টাকার ঋণ, ২০ থেকে ৩৮ শতাংশ সুদে; একটা গাড়ির দাম ৩৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা [৮]। দিনের শুরুতেই যাঁর ঘাড়ে ৪১৪ টাকার ভাড়া আর কিস্তি, তিনি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকার বিলাসিতা করতে পারেন না। যাত্রীও একই হিসাবে চলেন: ৭৪ শতাংশ যাত্রী গতিকে প্রাধান্য দেন, আর বাধ্য হলে ৯৩ শতাংশ নিরাপত্তার চেয়ে গতিকেই বেছে নেন—যদিও ৮২ শতাংশ স্বীকার করেন ঝুঁকিটা তাঁরা জানেন [১০]।
সবচেয়ে বড় কারণটা অবশ্য সবচেয়ে সাদামাটা: ঢাকায় শেষ কিলোমিটারের কোনো বাহন নেই। মেট্রোরেল স্টেশন থেকে বাসা, বাস স্ট্যান্ড থেকে অফিস, হাসপাতাল থেকে গলির মুখ—এই দূরত্বগুলো বাসে যাওয়া যায় না, সিএনজিতে পোষায় না, প্যাডেল রিকশায় সময় লাগে। ব্যাটারি রিকশা সেই ফাঁকটা পূরণ করেছে। মানুষ তাই ওঠে, আর প্রশাসন তাই বারবার নিষেধ করেও ফেরাতে পারে না।
৫. রাস্তায় এর ফল
বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরে সারা দেশে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ির ৯০০টি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যার ৫৮২টি গুরুতর; ২০২৪ সালে বিদ্যুৎচালিত তিন চাকার গাড়ি ছিল নথিভুক্ত দুর্ঘটনার ১৬.৫ শতাংশে আর মৃত্যুর ২১ শতাংশে [৪]। ২০২৫ সালে নথিভুক্ত ৬,৭২৯টি দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের ১৩.৫৪ শতাংশ ছিল ব্যাটারি অটোরিকশা, সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য [৬]। বড় ছবিটা আরও উদ্বেগের: বিআরটিএর হিসাবে ২০২৫ সালে সড়কে মারা গেছেন ৫,৪৯০ জন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি; ২০১৮ সালে সংখ্যাটা ছিল ২,৬৩৫ [১১]। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গণমাধ্যম ধরে গুনেছে আরও বেশি—৭,৫৮৪ দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ মৃত্যু, যার ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট [১২]। ইনোভিশনের জরিপে ব্যাটারি রিকশার ৩০ শতাংশ যাত্রী দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন, প্যাডেল রিকশায় ১৮ শতাংশ; আর ব্যাটারি রিকশার দুর্ঘটনায় গুরুতর আঘাতের হার ৪৪.৫ শতাংশ [৮]।
যানজটের ওপর প্রভাবটা সংখ্যায় আলাদা করে মাপা কঠিন, কিন্তু যন্ত্রটা বোঝা সহজ। এক লেনে ধীর আর দ্রুত গাড়ি মিশলে পুরো লেনের গতি ধীর গাড়ির গতিতে নেমে আসে। মূল সড়কে ঘণ্টায় ২০-২৫ কিলোমিটারে চলা হাজার হাজার রিকশা, যেগুলো যেকোনো জায়গায় থামে আর যেকোনো জায়গায় ঘোরে, বাস আর গাড়ির লেনকে কার্যত রিকশার লেন বানিয়ে দেয়। ঢাকার মূল সড়কগুলো এ কারণেই এখন সন্ধ্যার পরও চলে না।
৬. বিদ্যুতের বিল কে দিচ্ছে
সিপিডির হিসাবে বিদ্যুৎচালিত তিন চাকার গাড়ি দেশের দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট খায় [৪]। এর বড় অংশ চার্জ হয় মধ্যরাতের পর, অবৈধ সংযোগে: সারা দেশে অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট প্রায় ৩,৩০০, অথচ শুধু ঢাকাতেই অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ৪৮ হাজারের বেশি; বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা [৬]। যে বিদ্যুতের জন্য গ্রামে সেচের সময় লোডশেডিং হয়, সেই বিদ্যুতের একটা অংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে চার্জিং গ্যারেজে, আর তার লাভ যাচ্ছে গ্যারেজ মালিকের পকেটে, চালকের নয়। লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিগুলো প্রতি কয়েক মাসে বদলাতে হয়, আর পুরোনোগুলো কোথায় যায়, তার কোনো হিসাব নেই।
৭. ঢাকার বাইরে
সমস্যাটা ঢাকার একার নয়; আকারে বরং উল্টো। উপজেলা আর ইউনিয়ন পর্যায়ে ইজিবাইক এখন কার্যত একমাত্র গণপরিবহন—স্কুল, বাজার, হাসপাতাল সবই এই গাড়িতে। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকার মহাসড়কে তিন চাকার গাড়ি নিষিদ্ধ করে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কাগজেই থেকেছে; ইজিবাইক, নছিমন-করিমন মহাসড়কে চলছে এবং সেখানে দুর্ঘটনার একটা বড় অংশ এই মিশ্র চলাচল থেকেই আসছে [৯]। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, একতরফা নিষেধাজ্ঞা গ্রামীণ মানুষের চলাচল আর লাখো পরিবারের আয় দুটোই কেড়ে নেবে, সমস্যার সমাধান না করেই [১৩]। ঢাকার জন্য যা প্রয়োজন, উপজেলার জন্য তা আলাদা: সেখানে দরকার মহাসড়কের পাশে সার্ভিস লেন আর বাজারের মোড়ে আলাদা লেন, নিষেধাজ্ঞা নয়।
৮. নিষেধাজ্ঞা কেন বারবার ব্যর্থ হয়
তালিকাটা লম্বা। ২০১৪ সালে হাইকোর্ট বলে, লাইসেন্স দেওয়ার কর্তৃপক্ষ না থাকায় সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারি রিকশা চলতে পারে না। ২০২৪ সালের মে মাসে সরকার ঢাকা থেকে এগুলো সরানোর ঘোষণা দেয়, তিন দিনের বিক্ষোভের পর সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেয় [৭, ১৪]। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট তিন কর্মদিবসে ঢাকায় চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেয়; চালকেরা ১১ দফা দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন, আর ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগ এক মাসের স্থিতাবস্থা দেয় [১৫]। ২০২৫ সালের এপ্রিল-মে মাসে ঢাকা উত্তর সিটি ও পুলিশ গুলশান-বনানীতে অভিযান চালায়, শতাধিক গাড়ি জব্দ হয়, মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-যাত্রাবাড়ীতে রাস্তা আটকে বিক্ষোভ হয়, সেনাবাহিনী ডাকতে হয় [৭]। প্রতিবারই একই ছক: ঘোষণা, অভিযান, বিক্ষোভ, পিছু হটা।
ব্যর্থতার কারণ তিনটি। এক, নিষেধাজ্ঞার বদলে যে বাহনটা মানুষ ব্যবহার করবে, সেটা দেওয়া হয়নি। দুই, গাড়ির কোনো নিবন্ধন নেই, তাই কাকে ধরা হচ্ছে আর কাকে ছাড়া হচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই; জব্দ করা গাড়ি কয়েক দিনেই আবার রাস্তায়। তিন, যাঁদের ওপর অভিযান, তাঁরা এই শহরের সবচেয়ে দুর্বল মানুষ—ঋণে কেনা গাড়ি, দিনের আয় দিনে শেষ—তাঁদের সঙ্গে লড়ে কোনো সরকার জেতে না।
গত এক বছরে অবশ্য সুর বদলেছে। ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ সিটি করপোরেশন এলাকায় "স্বল্পগতির তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা" জারি করে: ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার, স্কুল এলাকায় ১৫, বাধ্যতামূলক স্পিড গভর্নর, দৈর্ঘ্য ২৫০ ও প্রস্থ ১১০ সেন্টিমিটারের মধ্যে, চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই যাত্রী [১৬]। ২০২৬ সালে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন সংশোধন করে সিটি করপোরেশনকে ই-রিকশা নিবন্ধন ও লাইসেন্সের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, আর আগস্টে পৌরসভা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যন্ত একটি সমন্বিত নীতির কাজ শুরু হয়েছে [১৭]। বুয়েটের নকশায় বানানো রিকশা পল্টন, ধানমন্ডি ও উত্তরায় পাইলট হিসেবে নেমেছে; লক্ষ্য এক লাখ চালককে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স দেওয়া [১৬, ১৮]। আর ৩০ আগস্ট স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, চূড়ান্ত নীতিতে মূল সড়কে ব্যাটারি রিকশা থাকবে না, নিবন্ধিত চার আসনের গাড়ি চলবে ভেতরের সড়কে, ঢাকা ভাগ হবে আটটি জোনে, এক জোনের গাড়ি অন্য জোনে যাবে না [৪]। দিকটা ঠিক। প্রশ্ন হলো, এবার কাজটা শেষ হবে কি না।
৯. যা করলে সত্যিই বদলাবে: আমাদের প্রস্তাব
প্রথম, নিষেধ নয়, নিবন্ধন—এবং সেটা মাসের মধ্যে। প্রতিটি গাড়ির কিউআর নম্বরপ্লেট, প্রতিটি চালকের ছবিসহ লাইসেন্স, একটি গাড়ি একটি জোন। ছয় মাসের সাধারণ ক্ষমার সময় দিন, তার মধ্যে যে নিবন্ধন করবে না, তার গাড়ি নিলামে উঠবে। নিবন্ধিত চালককে চাঁদাবাজি থেকে সুরক্ষা দিন; সেটাই তাঁকে নিয়মের পক্ষে আনবে।
দ্বিতীয়, গাড়িটা বদলান, মানুষটাকে নয়। বুয়েট-অনুমোদিত নকশা—সব চাকায় ব্রেক, স্পিড গভর্নর, দুই যাত্রী—বাধ্যতামূলক হোক। কিন্তু যে চালক ২০-৩৮ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে পুরোনো গাড়ি কিনেছেন, তাঁকে "নতুন গাড়ি কিনুন" বললে হবে না। পুরোনো গাড়ি জমা দিয়ে অনুমোদিত গাড়ি নেওয়ার বিনিময় প্রকল্প হোক, সরকারি ব্যাংকের একক অঙ্কের সুদে, নিবন্ধনের সঙ্গেই।
তৃতীয়, রাস্তার শ্রেণিবিন্যাস। মূল সড়ক থেকে সরাতে হলে বিকল্প দিতে হবে: প্রতিটি মেট্রো ও বড় বাস স্টেশনের চারপাশে ফিডার রুট, সেকেন্ডারি সড়কে চিহ্নিত লেন, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড। জিওফেন্সিং দিয়ে জোন নিয়ন্ত্রণ করা যায়; কিন্তু জিওফেন্সিংয়ের আগে দরকার ফিডার রুটের নকশা প্রকাশ করা, যাতে চালক জানেন কোথায় চলা যাবে।
চতুর্থ, চার্জিং বৈধ করুন, চুরি বন্ধ করুন। গ্যারেজে মিটারযুক্ত বাণিজ্যিক সংযোগ, দিনের অফ-পিক সময়ে চার্জে ছাড়, লাইসেন্সধারী চার্জিং হাব আর ব্যাটারি বদলের কেন্দ্র; সঙ্গে পুরোনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা। ৪৮ হাজার অবৈধ পয়েন্ট বন্ধ করা যায় একটাই উপায়ে: বৈধ পয়েন্টকে সস্তা ও সহজ করে।
পঞ্চম, গ্যারেজ-মালিকের জবাবদিহি। দিনের ভাড়া যেখানে আয়ের অর্ধেক, সেখানে চালক নিয়ম মানবেন না—মানতে পারবেন না। গ্যারেজের নিবন্ধন, ভাড়ার ঊর্ধ্বসীমা, আর দুর্ঘটনায় বা নিয়মভঙ্গে জরিমানার একটা অংশ গাড়ির মালিকের ঘাড়ে—তবেই মালিকেরা ঠিক গাড়ি রাখবেন আর ঠিক চালককে দেবেন।
ষষ্ঠ, তথ্য প্রকাশ। প্রতি মাসে জোনভিত্তিক দুর্ঘটনা, জব্দ, লাইসেন্স আর চার্জিংয়ের হিসাব একটি পাতায় প্রকাশ হোক। যে নীতি মাপা যায় না, সেটা টেকে না।
সপ্তম, ঢাকার বাইরে আলাদা নীতি। উপজেলায় নিবন্ধনের কর্তৃপক্ষ উপজেলা পরিষদ, মহাসড়কে বাজার ও ক্রসিংয়ের কাছে সার্ভিস লেন, আর যেখানে সার্ভিস লেন নেই সেখানে নির্দিষ্ট পারাপারের জায়গা। মহাসড়কে ইজিবাইক নিষিদ্ধ থাকুক, কিন্তু নিষেধাজ্ঞাটা তখনই মানা যাবে, যখন পাশ দিয়ে যাওয়ার রাস্তা থাকবে।
শেষ কথা
ব্যাটারি রিকশা ঢাকার সমস্যা নয়; ঢাকার সমস্যার লক্ষণ। যে শহরে গণপরিবহন শেষ কিলোমিটার পৌঁছায় না, যে শহরে লাখো মানুষের অন্য কোনো কাজ নেই, আর যে শহরে নিয়ম ঘোষণা হয় কিন্তু কার্যকর হয় না—সেখানে এই গাড়িটা আসবেই। আমরা চাই সরকার এবার নিষেধাজ্ঞার সহজ পথ না নিয়ে নিবন্ধন, নিরাপদ গাড়ি, ফিডার রুট আর বৈধ চার্জিংয়ের কঠিন পথটা শেষ পর্যন্ত হাঁটুক। চালকের আয় বাঁচিয়ে, যাত্রীর সময় বাঁচিয়ে, রাস্তার প্রাণ বাঁচিয়ে—তিনটাই একসঙ্গে সম্ভব, যদি কাজটা অর্ধেক পথে ফেলে না রাখা হয়।
তথ্যসূত্র
- [১] বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকার গতি ২১ থেকে ৭ কিলোমিটার, দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট — Dhaka Tribune: https://www.dhakatribune.com/business/265726/the-economic-cost-of-dhaka%E2%80%99s-insane-traffic
- [২] বুয়েটের গবেষণা: ২০২০ সালে ৬.৫ ও ২০২২ সালে ৪.৮ কিলোমিটার — The Week: https://www.theweek.in/wire-updates/international/2023/09/30/fes25-bangla-traffic-speed-study.html
- [৩] যানজটে বছরে ৩৭-৫৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি (বুয়েট এআরআই) — Dhaka Tribune: https://www.dhakatribune.com/opinion/op-ed/410596/the-economic-burden-of-dhaka%E2%80%99s-congested-transport
- [৪] ঢাকায় ৬ লাখ ব্যাটারি রিকশা (বুয়েট ২০২৫), এআরআইয়ের দুর্ঘটনার হিসাব, সিপিডির ৭৫০ মেগাওয়াট, ৩০ আগস্ট ২০২৬-এর নীতির রূপরেখা — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/bangladesh/battery-rickshaws-transport-solution-menace-dhaka-roads-1529241
- [৫] সরকারের ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর হিসাব: ঢাকায় ১২ লাখ, দেশে ৪০ লাখ — Dhaka Tribune: https://www.dhakatribune.com/business/408819/battery-run-rickshaws-strain-bangladesh-s-power
- [৬] সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ৫০-৮০ লাখ গাড়ি, ৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি, ৩,৩০০ বৈধ বনাম ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট, ২০২৫ সালের দুর্ঘটনায় ১৩.৫৪ শতাংশ — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/economy/illegal-auto-rickshaw-charging-drains-tk4000cr-revenue-every-year-salahuddin-1536006
- [৭] নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস ২০১৪-২০২৫, গুলশান-বনানী-বাড্ডায় ৩ থেকে ৮ হাজার — Dhaka Tribune: https://www.dhakatribune.com/bangladesh/dhaka/418699/battery-rickshaws-can-the-govt-finally-keep-them
- [৮] গাড়ির দাম, ঋণের সুদ, ৯৭.৪ শতাংশ অনিবন্ধিত, দুর্ঘটনার তুলনা — The Daily Star: https://www.thedailystar.net/slow-reads/unheard-voices/news/dhakas-tesla-technological-upgrade-or-poverty-trap-4144236
- [৯] মহাসড়কে তিন চাকার নিষেধাজ্ঞা (১৫ ডিসেম্বর ২০২১) ও তার বাস্তবায়ন — The Daily Star: https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/transport/news/govt-goes-soft-3-wheelers-highways-3170371
- [১০] ইনোভিশন কনসাল্টিং, "Urban Mobility Study: Rickshaws in Transition", জানুয়ারি ২০২৬ — Dhaka Tribune: https://www.dhakatribune.com/bangladesh/401303/study-warns-battery-rickshaws-dominate-dhaka%E2%80%99s
- [১১] বিআরটিএর হিসাবে ২০২৫ সালে ৫,৪৯০ মৃত্যু, ২০১৮ থেকে বছরওয়ারি তুলনা — Bonik Barta: https://en.bonikbarta.com/bangladesh/gyWM582NKumWKeL8
- [১২] রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন — Prothom Alo: https://en.prothomalo.com/bangladesh/accident/35tuiqg3oi
- [১৩] নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা (Public Health Challenges, 2022) — https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC12039690/
- [১৪] মে ২০২৪-এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার — The Business Standard: https://www.tbsnews.net/bangladesh/pm-orders-cancel-decision-ban-battery-run-auto-rickshaws-allows-those-run-city-roads
- [১৫] হাইকোর্টের আদেশ ১৯ নভেম্বর ২০২৪, আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা, চালকদের ১১ দফা — Global Voices: https://globalvoices.org/2024/12/27/how-to-stop-battery-operated-rickshaws-from-causing-new-problems-on-dhakas-roads/
- [১৬] ই-রিকশা বিধিমালা ২০২৫ (৩০ কিমি, ১৫ কিমি, মাপ, দুই যাত্রী) ও পাইলট — Daily Sun: https://www.daily-sun.com/bangladesh/849601/eco-friendly-e-rickshaw-pilot-programme-launched-in-dhaka
- [১৭] স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন ২০২৬ ও সমন্বিত নীতির উদ্যোগ, আগস্ট ২০২৬ — Energy Tribune: https://www.theenergytribune.com/news/2026/08/13/258269
- [১৮] বুয়েটের নকশার রিকশা: পল্টন, ধানমন্ডি, উত্তরা; এক লাখ চালকের প্রশিক্ষণ — The Daily Star: https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/transport/news/buet-designed-battery-run-rickshaws-set-roll-out-paltan-dhanmondi
মন্তব্য